• 01 Nov, 2026

ত্রিশালের নজরুল স্মৃতি ভ্রমণ গাইড — ১৯১৩–১৪ সালে কিশোর নজরুলের কাজীর শিমলা আগমন, দরিরামপুর স্কুলের দিনগুলো, নামাপাড়ার বটগাছ, দুটি নজরুল স্মৃতি কেন্দ্রের বর্তমান অবস্থা এবং ২০২৬ সালের জাতীয় পর্যায়ের জন্মজয়ন্তীর খবর।

ময়মনসিংহ শহর থেকে প্রায় ২২–২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে ত্রিশাল — বাংলাদেশের জাতীয় কবির জীবনের এক অনন্য ঠিকানা। বর্ধমানের চুরুলিয়ায় জন্ম নেওয়া কাজী নজরুল ইসলামের আজকের বাংলাদেশের মাটিতে প্রথম পদার্পণ ছিল এই ত্রিশালের কাজীর শিমলা গ্রামেই (ঢাকা ট্রিবিউন)। ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর লেটো দলের গান পেছনে ফেলে এক কিশোর এখানে এসেছিল পড়াশোনা করতে — সেই দেড় বছরের স্মৃতিই ত্রিশালের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

রুটির দোকান থেকে কাজীর শিমলা

আসানসোলে রুটির দোকান আর চায়ের দোকানে কাজ করা ১৪ বছর বয়সী নজরুলের সাহিত্যিক ঝলক নজরে পড়ে সেখানে কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তা কাজী রফিজউল্লাহর (ঢাকা ট্রিবিউন; দ্য ডেইলি স্টার)। তিনিই কিশোরটিকে নিয়ে আসেন নিজের পৈতৃক গ্রাম কাজীর শিমলার দারোগাবাড়িতে। আসার বছর নিয়ে সূত্রে মতভেদ আছে — গবেষকদের একাংশ বলেন ১৯১৩, অন্য প্রতিবেদনে ১৯১৪ (দ্য ডেইলি স্টার; বাসস) — তবে সবাই একমত যে থাকার মেয়াদ ছিল প্রায় এক থেকে দেড় বছর। ভর্তি হন প্রায় ৫–৬ কিলোমিটার দূরের দরিরামপুর হাই স্কুলে (বর্তমান নজরুল একাডেমি) — শ্রেণি নিয়েও সূত্র দুই রকম (ষষ্ঠ বা সপ্তম)। প্রধান শিক্ষক ছিলেন বিপিনচন্দ্র চক্রবর্তী (দ্য ডেইলি স্টার)। পথের দূরত্বের কারণে পরে তিনি উঠে যান স্কুলের কাছের নামাপাড়ায় বেচুটিয়া বেপারীর বাড়িতে।

বাঁশিওয়ালা বটগাছ আর পুঁথিপড়া কিশোর

স্কুলে যাওয়ার পথে নামাপাড়ার এক বটগাছের নিচে বসে বাঁশি বাজাতেন কিশোর নজরুল — গাছটি আজও আছে, এখন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে (দ্য ডেইলি স্টার)। স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন পুঁথি পাঠ আর বাঁশির সুরে। স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই রবীন্দ্রনাথের "দুই বিঘা জমি" ও "পুরাতন ভৃত্য" আবৃত্তি করে তিনি পুরস্কার জিতে নেন (দ্য ডেইলি স্টার)। পরের বছরই ত্রিশাল ছেড়ে যান ভ্রাম্যমাণ স্বভাবের কবি — কিন্তু ত্রিশাল তাঁর লেখায়ও ছাপ রেখে যায়; তাঁর "অগ্নিগিরি" গল্পের পটভূমিতে এই অঞ্চলের স্মৃতি খুঁজে পান গবেষকরা।

স্মৃতি কেন্দ্র দুটি: যা আছে, যা নেই

নজরুলের স্মৃতি সংরক্ষণে সরকার ২০০৩ সালে দুটি নজরুল স্মৃতি কেন্দ্র গড়ে তোলে — একটি কাজীর শিমলার দারোগাবাড়িতে, অন্যটি নামাপাড়ায় (দ্য ডেইলি স্টার)। দুই কেন্দ্রে আছে এইচএমভির দুর্লভ গ্রামোফোন ও রেকর্ড, বাংলা-ইংরেজি-হিন্দি-উর্দুতে কবির হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি, আলোকচিত্র আর তাঁর ব্যবহার করা আসবাব (দ্য ডেইলি স্টার)। তবে সৎ চিত্রটাও জানা দরকার: দীর্ঘদিন ধরে দর্শনার্থীর সংখ্যা খুবই কম, গ্রন্থাগার সম্প্রসারিত হয়নি, কাজীর শিমলা কেন্দ্রের দেয়ালে ফাটলের খবরও এসেছে প্রতিবেদনে; ২০২৬ সালের মে মাসের প্রতিবেদনেও স্মৃতিচিহ্নের স্বল্পতা আর আধুনিক সুবিধার অভাবের কথা উঠে এসেছে (দ্য ডেইলি স্টার)। অর্থাৎ যাবেন ইতিহাসের টানে — প্রদর্শনীর জৌলুসের প্রত্যাশা নিয়ে নয়।

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় ও ২০২৬-এর নতুন অধ্যায়

নামাপাড়াতেই ২০০৫ সালের ১ মার্চ প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় — কবির নামে দেশের একমাত্র সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, যার ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে সেই বটগাছ (দ্য ডেইলি স্টার)। আর সবচেয়ে বড় খবরটি সাম্প্রতিক: প্রায় দুই দশক পর ২০২৬ সালের মে মাসে ত্রিশালে আবার জাতীয় পর্যায়ে পালিত হয় কবির ১২৭তম জন্মজয়ন্তী — দরিরামপুরের নজরুল মঞ্চে তিন দিনের জাতীয় অনুষ্ঠান "তবু আমারে দেবে না ভুলিতে" ও নজরুল মেলা বসে; ঘোষণা আসে ২৫ মে ২০২৬ থেকে ২৫ মে ২০২৭ পর্যন্ত "নজরুল বর্ষ" পালনের এবং ত্রিশালকে "নজরুল সিটি" ঘোষণার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের (বাসস; দ্য ডেইলি স্টার)। ত্রিশাল ভ্রমণের গুরুত্ব এখন তাই আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

ভ্রমণ তথ্য

যাওয়া: ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কে ত্রিশাল; ময়মনসিংহ শহর থেকে প্রায় ২২–২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে। কাজীর শিমলা ও নামাপাড়া ত্রিশাল সদরের কাছাকাছি — স্থানীয় যানবাহনে সহজে যাওয়া যায়। কখন: জন্মজয়ন্তীর সময় (মে মাস) ত্রিশাল সবচেয়ে প্রাণবন্ত; অন্য সময়ে শান্ত পরিবেশে ঘোরা যায়। টিপস: স্মৃতি কেন্দ্র দুটি, নজরুল একাডেমি আর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বটগাছ — এই তিনটি জায়গা এক রুটে সাজান; কেন্দ্রগুলোতে দর্শনার্থী কম থাকায় সময় নিয়ে দেখা যায়। ময়মনসিংহে এসে জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা দেখলে একই জেলায় দুই জাতীয় মনীষীর স্মৃতি এক সফরেই ছোঁয়া যায়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

নজরুল ত্রিশালে কবে এসেছিলেন?

১৯১৩ বা ১৯১৪ সালে (সূত্রভেদে মতভেদ আছে), ১৪ বছর বয়সে, পুলিশ কর্মকর্তা কাজী রফিজউল্লাহর সঙ্গে (দ্য ডেইলি স্টার; বাসস)।

কোন স্কুলে পড়তেন?

দরিরামপুর হাই স্কুলে — বর্তমান নাম নজরুল একাডেমি।

স্মৃতি কেন্দ্র কয়টি ও কোথায়?

দুটি — কাজীর শিমলায় (দারোগাবাড়ি) ও নামাপাড়ায়; দুটিই প্রতিষ্ঠিত ২০০৩ সালে (দ্য ডেইলি স্টার)।

বাঁশি বাজানোর বটগাছটি কোথায়?

নামাপাড়ায়, এখন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে।

ত্রিশালে জাতীয় পর্যায়ের জন্মজয়ন্তী আবার কবে হলো?

২০২৬ সালের মে মাসে, প্রায় দুই দশক পর; সেই সঙ্গে ২০২৬–২৭ সালকে "নজরুল বর্ষ" ঘোষণা করা হয়েছে (বাসস)।

ত্রিশাল শহর থেকে কত দূরে?

ময়মনসিংহ শহর থেকে প্রায় ২২–২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে, ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কে।

শেষকথা

কুমিল্লা-ঢাকায় নজরুলের স্মৃতি পরিণত বয়সের; ত্রিশালের স্মৃতি এক ক্ষুধার্ত, বাঁশিবাজানো কিশোরের — যার মধ্যে তখনো "বিদ্রোহী" জন্ম নেয়নি। সাহিত্যের সেই শুরুর পথ ধরে হাঁটতে চাইলে ত্রিশালই বাংলাদেশের সবচেয়ে খাঁটি ঠিকানা।