• 01 Nov, 2026

গজনী অবকাশ কেন্দ্র ভ্রমণ গাইড — ঝিনাইগাতীর গারো পাহাড়ের পাদদেশে ১৯৯৩ সালে গড়া অবকাশ কেন্দ্রের ইতিহাস, ৬৪ ফুট সাইট ভিউ টাওয়ার ও কৃত্রিম লেক, গারো মা ভিলেজ, ২০২৫ সালে চিড়িয়াখানা থেকে বন্যপ্রাণী উদ্ধারের সৎ নোট এবং ২০২৬ সালের সংস্কার-পরিকল্পনা।

শেরপুর শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার উত্তরে, ভারতের মেঘালয় সীমান্তের গা ঘেঁষে ঝিনাইগাতী উপজেলার কাংশা ইউনিয়নে গারো পাহাড়ের ঢালে ছড়িয়ে থাকা গজনী অবকাশ কেন্দ্র বৃহত্তর ময়মনসিংহের সবচেয়ে পরিচিত পর্যটন ঠিকানা। শাল-সেগুন-গজারীর বন, পাহাড়ি ছড়া, কৃত্রিম লেক আর টিলার পর টিলা — শীতের ভোরে এখানকার কুয়াশামাখা সবুজ দেখলে বোঝা যায়, কেন শতবর্ষ ধরে মানুষ এখানে ফিরে ফিরে আসে।

ব্রিটিশ আমলের পিকনিক স্পট থেকে জেলা প্রশাসনের কেন্দ্র

এলাকাটি ব্রিটিশ আমল থেকেই পিকনিক স্পট হিসেবে পরিচিত ছিল (প্রথম আলো)। আধুনিক অবকাশ কেন্দ্রটি গড়ে তোলে শেরপুর জেলা প্রশাসন, ১৯৯৩ সালে (বাংলা উইকিপিডিয়া) — প্রায় ৯০ একর পাহাড়ি এলাকা জুড়ে এর বিস্তার (মূল কেন্দ্রটি প্রায় ৩৩ একর — সূত্রভেদে আয়তনের ভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়)। পুরোনো এক বটগাছের পাশে প্রায় ২০০ ফুট উঁচু টিলার চূড়ায় গড়া হয়েছে অবকাশ ভবন — ছয় কক্ষের রেস্ট হাউস (প্রথম আলো; ভ্রমণ গাইড)। প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে নানা ভাস্কর্য — প্রবেশমুখে মৎস্যকন্যা 'জলপরী', ডাইনোসর ও ড্রাগনের প্রতিকৃতি, হাতি-জিরাফের মূর্তি, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ও জাতীয় কবি নজরুলের স্মৃতিফলক, এমনকি গজারী বনে গাছে গাছে কবিতা ঝোলানো 'কবিতাঙ্গন' (বাংলা উইকিপিডিয়া; আদার ব্যাপারী)।

লেক, টাওয়ার আর ঝুলন্ত সেতু

পাহাড়ি ঝরনার গতিপথে বাঁধ দিয়ে তৈরি কৃত্রিম লেকে প্যাডেল বোট ও ময়ূরপঙ্খী নৌকায় ঘোরা যায়; লেকের মাঝে কৃত্রিম পাহাড়ে 'লেক ভিউ পেন্টাগন', সেখানে যাওয়ার দোদুল্যমান সেতু — আর সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে ভাসমান সেতুও (ভ্রমণ গাইড)। কেন্দ্রের চেনা আকর্ষণ ৬৪ ফুট উঁচু সাইট ভিউ টাওয়ার — ওপরে উঠলে একদিকে পুরো কেন্দ্রের ৩৬০ ডিগ্রি দৃশ্য, অন্যদিকে মেঘালয়ের পাহাড়সারি; ভ্রমণ-বিবরণে ভাগ্য ভালো হলে সীমান্তে বন্য হাতির দেখা মেলার কথাও আছে — তবে সেটি নিয়মিত ঘটনা নয়। পাহাড় কেটে বানানো কৃত্রিম জলপ্রপাত 'আলোকের ঝরনাধারা'-র ওপর দিয়ে এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যাওয়ার ক্যাবল কার ও পায়ে হাঁটার ঝুলন্ত ব্রিজ আছে; চূড়া থেকে নামার আঁকাবাঁকা পথের নাম পদ্মসিঁড়ি — দুই শতাধিক সিঁড়ি (বাংলা উইকিপিডিয়া)। সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ছয়টি নতুন রাইডও চালু হয়েছে (প্রথম আলো, ডিসেম্বর ২০২৪) — তবে রাইডের চালু-অবস্থা সফরের সময় বদলাতে পারে, গিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিন।

গারো মা ভিলেজ ও পাহাড়ের মানুষ

গজনীর সবচেয়ে অর্থবহ অংশটি সম্ভবত গারো মা ভিলেজ (অমৃতলোক) — গারোদের বাসস্থানের ধারণায় নির্মিত এই অংশে গারো জনগোষ্ঠীর জীবনধারা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়েছে; ঢালের আসন-ছাতার নিচে বসে পাহাড়ি জনপদের জীবনমান দেখার ব্যবস্থাও আছে (ভ্রমণ-বিবরণ)। গারো ছাড়াও এই পাদদেশে কোচ, হাজং, বানাই, ডালু, হদি সম্প্রদায়ের বাস (আদার ব্যাপারী)। কেন্দ্রে আদিবাসী জাদুঘর ও মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক জাদুঘরও রয়েছে (বাংলা উইকিপিডিয়া)। গারো মা ভিলেজ নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে — গত ৩১ অক্টোবর ২০২৬-এও এটি নিয়ে পত্রিকায় বিশেষ প্রতিবেদন এসেছে (সংবাদ প্রতিবেদন)। আদিবাসী এলাকায় ছবি তোলার আগে অনুমতি নেওয়া ভদ্রতা।

সৎ নোট: চিড়িয়াখানা ও সংস্কার

দুটি তথ্য পাঠকের জানা দরকার। এক, কেন্দ্রের মিনি চিড়িয়াখানায় একসময় প্রায় ৪০ প্রজাতির প্রাণী ছিল বলে লেখা হয় (বাংলা উইকিপিডিয়া); কিন্তু ২০২৫ সালের এপ্রিলে বন বিভাগের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের অভিযানে সেখান থেকে অজগর, বনবিড়াল, গন্ধগোকুল, বানর, শিয়াল ও হরিণসহ ১৭টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয় (বাংলাদেশ প্রতিদিন)। অর্থাৎ চিড়িয়াখানার বর্তমান সংগ্রহ গাইডবইয়ের বর্ণনার চেয়ে ছোট হতে পারে। দুই, কেন্দ্রের সেবার মান নিয়ে অভিযোগও আছে — ১৬ অক্টোবর ২০২৬-এ এখানে পর্যটন-বিকাশ নিয়ে কর্মশালা হয়, যেখানে জেলা প্রশাসক সিসিটিভি ও সোলার প্যানেল সংস্কারসহ সার্বিক উন্নয়নের আশ্বাস দেন (সংবাদ প্রতিবেদন)।

ভ্রমণ তথ্য

যাওয়া: শেরপুর শহর থেকে বাস/সিএনজি/অটোতে ঝিনাইগাতী হয়ে গজনী (~৩০ কিমি); ঢাকা থেকে প্রায় ২২০ কিমি (ভ্রমণ গাইড)। রাংটিয়া বাজার পেরিয়ে গজারী-শালের ছায়াঘেরা আঁকাবাঁকা পথটাই সফরের সুন্দর শুরু। থাকা: কেন্দ্রের রেস্ট হাউসে থাকতে জেলা প্রশাসন/কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আগাম বুকিং লাগতে পারে — শেরপুর শহরে হোটেলে থেকে দিনের সফরই সহজ। পিকনিক: নলকূপের পানি, স্যানিটেশন ও রান্নার ব্যবস্থাসহ পিকনিকের সুযোগ আছে (ভ্রমণ গাইড)। কখন: নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি সেরা। সতর্কতা: সীমান্তবর্তী এলাকা — নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে যাবেন না; বর্ষায় পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল। পাশের জেলার আরেক গারো-পাদদেশের স্পট লাউচাপড়া — দুটো এক সফরে মেলানো যায়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

গজনী অবকাশ কেন্দ্র কোথায়?
শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার কাংশা ইউনিয়নে, গারো পাহাড়ের পাদদেশে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

কেন্দ্রটি কবে, কে তৈরি করে?
শেরপুর জেলা প্রশাসন, ১৯৯৩ সালে; এলাকাটি ব্রিটিশ আমল থেকে পিকনিক স্পট (প্রথম আলো)।

ওয়াচ টাওয়ার কত উঁচু?
৬৪ ফুট (বাংলা উইকিপিডিয়া; ভ্রমণ গাইড)।

লেকে নৌকা চলে কি?
প্যাডেল বোট ও ময়ূরপঙ্খী নৌকার ব্যবস্থা আছে (ভ্রমণ গাইড)।

মিনি চিড়িয়াখানা কি আগের মতো আছে?
২০২৫ সালের এপ্রিলে বন বিভাগ ১৭টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে — সংগ্রহ আগের চেয়ে কম হতে পারে (বাংলাদেশ প্রতিদিন)।

সেরা সময় কোনটি?
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি (ভ্রমণ গাইড)।

শেষকথা

গজনী একদিকে কৃত্রিম রাইড-সজ্জিত পার্ক, অন্যদিকে সত্যিকারের গারো পাহাড়ের বন — এই দুয়ের টানাপোড়েনই তার চরিত্র। প্রত্যাশা ঠিক করে গেলে (প্রকৃতির জন্য যান, রাইড বোনাস) শীতের একটা দিন এখানে কাটিয়ে যাওয়া মনে রাখার মতো অভিজ্ঞতা হবে।