• 01 Nov, 2026

শশী লজ ও আলেকজান্ডার ক্যাসল ভ্রমণ গাইড — সূর্যকান্ত আচার্যের দুই প্রাসাদের ইতিহাস, ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্প ও পুনর্নির্মাণ, ভেনাস মূর্তির বর্তমান অবস্থা, লোহার কুঠিতে রবীন্দ্রনাথের ১৯২৬ সালের সফর এবং ভ্রমণ তথ্য।

ময়মনসিংহ শহরের প্রাণকেন্দ্রে, অল্প দূরত্বে দাঁড়িয়ে দুটি প্রাসাদ — দুটোই মুক্তাগাছার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর কীর্তি, দুটোতেই জড়িয়ে ভূমিকম্প, পুনর্নির্মাণ আর রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি। একটি এখন জাদুঘর, অন্যটি টিকে আছে নাজুক অবস্থায়।

শশী লজ: ভূমিকম্পে ভেঙে আবার গড়া প্রাসাদ

উনিশ শতকের শেষভাগে শহরের কেন্দ্রে নয় একর জমির ওপর দোতলা প্রাসাদটি নির্মাণ করেন মহারাজা সূর্যকান্ত; নিঃসন্তান মহারাজা দত্তক পুত্র শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর নামে এর নাম রাখেন শশী লজ — স্থানীয়ভাবে "ময়মনসিংহ রাজবাড়ি" (ইত্তেফাক; প্রথম আলো)। কিন্তু ১৮৯৭ সালের ১২ জুনের মহা ভূমিকম্পে প্রাসাদটি বিধ্বস্ত হয়; ১৯০৫ সালে শশীকান্ত একই স্থানে নতুন করে তা নির্মাণ করেন, ১৯১১ সালে আরও সংস্কার হয় (ইত্তেফাক)। ভবনটির — যা "রংমহল" নামেও পরিচিত ছিল — প্রধান ফটকে রয়েছে ১৬টি গম্বুজ; ভেতরে প্রায় ১৮টি বিশাল কক্ষ, ঝুলন্ত ঝাড়বাতি, নাচঘর আর সুড়ঙ্গসহ স্নানঘর। স্থাপত্যে ইউরোপীয় ছোঁয়া এতটাই যে অনেকে এর সঙ্গে ঢাকার কার্জন হলের তুলনা করেন। পরিবারটির জমিদারির শুরু ১৭২৫ সালে, মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে (বিস্তারিত মুক্তাগাছার পোস্টে)।

বাগান, ভেনাস আর জলঘর: শশী লজ আজ

মূল ভবনের সামনের বাগানের মাঝখানে শ্বেতপাথরের ফোয়ারার সঙ্গে ছিল গ্রিক দেবী ভেনাসের মর্মর মূর্তি; পেছনে দোতলা স্নানঘর — স্থানীয়ভাবে "জলঘর" — পুকুর আর মার্বেল বাঁধানো ঘাট (ইত্তেফাক)। ১৯৫২ সাল থেকে ভবনটি ব্যবহৃত হয় মহিলা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ হিসেবে (মূল ভবন ছিল অধ্যক্ষের কার্যালয়)। ২০১৫ সালের ৪ এপ্রিল প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর জাদুঘর স্থাপনের জন্য শশী লজ অধিগ্রহণ করে; সংস্কারের পর এটি এখন শশী লজ জাদুঘর হিসেবে খোলা। একটি দুঃখের তথ্য: বাগানের স্নানরতা ভেনাস মূর্তিটি ২০২৪ সালের আগস্টের পর ভাঙচুরের শিকার হয়েছে বলে ভ্রমণ-সূত্রে জানা যায় — ফোয়ারাটি থাকলেও মূর্তির বর্তমান অবস্থা যাওয়ার আগে মেনে নেওয়া ভালো। প্রবেশ ফি সামান্য (সাম্প্রতিক ভ্রমণ-তথ্যে জনপ্রতি ৩০ টাকা; বদলাতে পারে)।

আলেকজান্ডার ক্যাসল: লোহার কুঠিতে রবীন্দ্রনাথ

দ্বিতীয় প্রাসাদটির নির্মাণে লোহার ব্যাপক ব্যবহার বলে স্থানীয় নাম "লোহার কুঠি" — পোশাকি নাম আলেকজান্ডার (আলেকজান্দ্রা) ক্যাসল। সূর্যকান্তই এর নির্মাতা; ব্যয় হয়েছিল তৎকালীন ৪৫ হাজার টাকা — এ বিষয়ে সূত্রগুলো একমত। তবে সাল নিয়ে মতভেদ আছে: প্রথম আলো (মে ২০২৫) ও একাংশের মতে এটি নির্মিত হয় ১৮৮৯ সালে, জেলা প্রতিষ্ঠার শতবার্ষিকী উপলক্ষে; ডেইলি স্টারসহ অন্য সূত্রে সালটি ১৮৭৯। নামকরণেও দুটি মত: সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ডের স্ত্রী আলেকজান্দ্রার নামে (প্রথম আলো), অথবা জেলার প্রথম ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডারের নামে — নিশ্চিত করে বলা কঠিন। ভেতরে ছিল শ্বেতপাথরের মেঝে আর রাজকীয় আসবাব; প্রায় সাড়ে ২৭ একর জমির এই ১৪ কক্ষের ভবন বহুদিন ধরেই ময়মনসিংহ শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজের গ্রন্থাগার। সবচেয়ে বিখ্যাত অধ্যায়: ১৯২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ময়মনসিংহে এসে চার দিন এই ক্যাসলেই অবস্থান করেন; প্রাঙ্গণের বটগাছের নিচে তাঁর সম্মানে আয়োজন হয় অনুষ্ঠানের — জায়গাটি আজ "রবীন্দ্র বটমূল" নামে পরিচিত (ডেইলি স্টার)। ২০১৮ সালের ৮ মার্চ ভবনটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকায় ওঠে; কিন্তু প্রথম আলোর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনের ভাষা সোজাসাপ্টা — "কাগজে-কলমেই সংরক্ষিত, বাস্তব চিত্র করুণ": ১৩৬ বছরের পুরোনো ভবনটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। অর্থাৎ দেখতে হলে কলেজের গ্রন্থাগার ভবন হিসেবে বাইরে ও প্রাঙ্গণ ঘুরেই দেখতে হবে, আর সংরক্ষণের এই হাল জেনেই যাওয়া উচিত।

ভ্রমণ তথ্য

অবস্থান: দুটোই ময়মনসিংহ শহরের কেন্দ্রে (কোর্ট-কাছারি/জিরো পয়েন্ট এলাকায়), রিকশা দূরত্বে। শশী লজ জাদুঘর: প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর পরিচালিত; বন্ধের দিনসহ সময় যাওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে জেনে নিন। আলেকজান্ডার ক্যাসল: কলেজের গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত — ভেতরে ঢোকা অনুমতি-সাপেক্ষ, সাধারণত বাইরে থেকে ও রবীন্দ্র বটমূল প্রাঙ্গণ দেখা যায়। সময়: শীতের সকাল-বিকেল সেরা; দুই প্রাসাদ মিলিয়ে ঘণ্টা দুয়েক রাখুন। টিপস: শশী লজের বাগান ও জলঘর দেখতে পেছন দিকটা অবশ্যই যান; ভেনাস মূর্তির বর্তমান অবস্থা নিয়ে প্রত্যাশা কম রাখুন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

শশী লজ কে, কার নামে নির্মাণ করেন?

মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী, দত্তক পুত্র শশীকান্তের নামে (উনিশ শতকের শেষভাগে)।

বর্তমান শশী লজ কত সালের?

১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে মূল ভবন বিধ্বস্ত হলে ১৯০৫ সালে শশীকান্ত পুনরায় নির্মাণ করেন (ইত্তেফাক)।

শশী লজ এখন কী?

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের জাদুঘর (২০১৫ সালে অধিগ্রহণের পর সংস্কার করে খোলা)।

আলেকজান্ডার ক্যাসল কত সালে নির্মিত?

সূত্রে মতভেদ — ১৮৭৯ (ডেইলি স্টারসহ) বা ১৮৮৯ (প্রথম আলো); ব্যয় ৪৫ হাজার টাকা, নির্মাতা সূর্যকান্ত — এতে একমত।

রবীন্দ্রনাথ এখানে কবে এসেছিলেন?

১৯২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি; চার দিন আলেকজান্ডার ক্যাসলে অবস্থান করেন (ডেইলি স্টার; প্রথম আলো)।

ভেনাস মূর্তিটি কি এখনো আছে?

ফোয়ারা আছে; মূর্তিটি ২০২৪ সালের আগস্টের পর ভাঙচুরের শিকার হয়েছে বলে ভ্রমণ-সূত্রে জানা যায়।

শেষকথা

এক ভূমিকম্প দুই প্রাসাদেরই ভাগ্য বদলে দিয়েছিল — একজন ফিরে পেয়েছে জাদুঘরের মর্যাদা, অন্যজন তালিকায় নাম পেলেও দাঁড়িয়ে আছে করুণ অবস্থায়। ময়মনসিংহের ঐতিহ্য দেখতে চাইলে এই বৈপরীত্য মেনেই যান: জৌলুসের গল্পের পাশাপাশি সংরক্ষণের বাস্তবতাটাও এই দুই প্রাসাদের শিক্ষা।