ময়মনসিংহ শহরের জমিদার-কীর্তি শুধু শহরেই থেমে নেই — উত্তরে গৌরীপুর আর উত্তর-পূর্বে ঈশ্বরগঞ্জের আঠারবাড়িতেও ছড়িয়ে আছে দুটি বিখ্যাত জমিদার পরিবারের গল্প। একদিকে মামলা-জটে বদলে যাওয়া প্রাসাদ আর কলেজে রূপ নেওয়া রাজবাড়ি, অন্যদিকে আঠারটি পরিবারের নামে নাম পাওয়া গ্রাম, যেখানে একদিন এসেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।
গৌরীপুর: যুগলকিশোরের এস্টেট আর রামগোপালপুরের বিধবারা
গৌরীপুর জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা যুগলকিশোর রায় চৌধুরী — ময়মনসিংহ ও জফরশাহী পরগনার জমিদার কৃষ্ণগোপাল রায় চৌধুরীর দত্তক পুত্র। জফরশাহীতে মহামারি দেখা দিলে তিনি ১৭৭০ সালে গৌরীপুরে এসে গৌরীপুর এস্টেট প্রতিষ্ঠা করেন (বাংলা উইকিপিডিয়া)। পরের গল্প আরও নাটকীয়: যুগলকিশোরের সঙ্গে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধে জড়ান তাঁর প্রয়াত জ্যাঠার দুই বিধবা স্ত্রী রত্নমালা ও নারায়ণী দেবী; মামলায় জয়ী হয়ে তাঁরা তরফ রায়ের অর্ধেক অংশ পান, আর তাতেই ১৭৭৭ সালের দিকে গৌরীপুর শহর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দক্ষিণে গড়ে ওঠে রামগোপালপুর জমিদার বাড়ি — বিরল এক নারী-প্রতিষ্ঠিত জমিদারি (বাংলা উইকিপিডিয়া)। পরবর্তী প্রজন্মে গৌরীপুরের রাজা ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী শিক্ষাখাতে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা দান করে তৎকালীন পূর্ব বাংলার সবচেয়ে বড় শিক্ষা-দাতা হয়েছিলেন বলে জানা যায়; ব্রিটিশদের দেওয়া "রাজা" উপাধিও তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)। এই পরিবারের স্থাপত্যশৈলীর বৈশিষ্ট্য ছিল বাংলো-ধাঁচ আর প্রচুর কাঠের ব্যবহার — ১৮৯৭-এর ভয়াবহ ভূমিকম্পের পরের সতর্কতা বলেই মনে করেন গবেষকরা (দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট)।
গৌরীপুর শহরের কমপ্লেক্স আজ
গৌরীপুর শহরের মূল জমিদার বাড়ির বড় অংশে এখন গৌরীপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজ (প্রতিষ্ঠা ১৯৮১) — অর্থাৎ প্রাসাদ আজ পাঠদানের আঙিনা (দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট)। বিশাল কমপ্লেক্সের অনেক ভবনই ভেঙে পড়েছে; টিকে আছে হাতে গোনা কয়েকটি স্থাপনা: বিশাল নাটমণ্ডপসহ দুর্গাবাড়ি মন্দির (সবার জন্য উন্মুক্ত), পারিবারিক মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, ছাত্রী হোস্টেল হিসেবে ব্যবহৃত আবাসিক ভবন আর কমপ্লেক্সের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ — প্রায় ১০০ ফুট চওড়া সম্মুখভাগের মূল ফটক, যার মাঝখানে গম্বুজাকার খিলান। কাছের কালীপুর অংশে আছে লাহিড়ী লজ — পুকুরপাড়ে প্রায় ১৫০ ফুট দীর্ঘ সম্মুখভাগের অসাধারণ বাংলো, যা এখন উপজেলা ভূমি অফিস ও থানা হিসেবে ব্যবহৃত। আর রেলযাত্রীদের কাছে গৌরীপুর মানেই গৌরীপুর জংশন — হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসে অমর হয়ে থাকা সেই স্টেশন (দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট)।
গৌরীপুর লজ: শহরের বুকে বিতর্কিত অতিথিশালা
গৌরীপুরের জমিদারদের সবচেয়ে আলোচিত স্থাপনাটি আসলে ময়মনসিংহ শহরেই — ব্রহ্মপুত্রের তীরে গৌরীপুর লজ। কিংবদন্তি অনুযায়ী, মহারাজা শশীকান্ত ব্রজেন্দ্র কিশোরকে নদীপাড়ের জমিটি দিয়েছিলেন শর্তে — ইট-পাথরের দালান তোলা যাবে না। তাই ১৮২৮ সালে চীনা কারিগর দিয়ে কাঠ, পাথর আর ঢেউটিনে গড়া হয় এই দোতলা লজ; পাথরের মেঝে, মজবুত স্তম্ভ আর খিলান আজও তার সাক্ষী (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস; দ্য ডেইলি স্টার)। সংগীতপ্রেমী ব্রজেন্দ্র কিশোরের এই লজে আসর বসাতেন ওস্তাদ এনায়েত খাঁর মতো শিল্পীরা। ১৯৪৭-এর পর ভবনটিতে ছিল ব্যাংকের শাখা (১৯৮৫ পর্যন্ত); বর্তমানে এটি ব্যাংকের সম্পত্তি — দোতলার কক্ষগুলো কর্মকর্তাদের গেস্ট হাউস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, দর্শনার্থীদের প্রবেশ প্রায়ই মেলে না। ২০২৬ সালের জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী ভবনটি আজও প্রত্নতাত্ত্বিক তালিকাভুক্ত নয়; স্থানীয় সংগঠন গেস্ট হাউস ব্যবহার বন্ধের দাবি জানিয়েছে, আর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের জরিপ এই বছরই জমা পড়েছে (দ্য ডেইলি স্টার) — অর্থাৎ লজটির ভবিষ্যৎ এখন সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
আঠারবাড়ি: আঠার পরিবারের গ্রামে রবীন্দ্রনাথ
ঈশ্বরগঞ্জ সদর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে আঠারবাড়ি — নামের পেছনেই পুরো ইতিহাস। যশোর থেকে আসা জমিদার দ্বীপ রায় চৌধুরী আড়াই শ বছর আগে এখানকার (তখনকার শিবগঞ্জ) জমিদারি কিনে পুত্রের নামে এলাকার নাম দেন রায় বাজার; জমিদার বাড়ির কাজকর্মের জন্য যশোর থেকে তিনি নিয়ে আসেন আঠারটি হিন্দু পরিবার, তাদের বাড়ি করে দেন — সেই থেকে জায়গাটির নাম আঠারবাড়ি (বাংলা উইকিপিডিয়া; ভ্রমণ গাইড)। উত্তরাধিকারীদের ধারায় পালিত-পুত্র প্রমোদ চন্দ্র রায় চৌধুরী হন জমিদার — তিনি ছিলেন শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের ছাত্র। ১৯২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি তাঁর আমন্ত্রণে কবিগুরু আসেন আঠারবাড়ি রাজবাড়িতে: রেলস্টেশনে গণসংবর্ধনা, বাউল ও জারি গানের আসর, মধ্যাহ্নভোজ; প্রমোদ কবিকে উপহার দেন কাছারিবাড়ির "সোনালি চাবি", যা দিয়ে কবি নিজে কাছারিবাড়ির প্রধান দরজা খোলেন (দ্য ডেইলি স্টার)। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর "চন্দ্রকথা" (২০০৩) ছবির শুটিংও করেছিলেন এই বাড়িতেই। ১৯৬৮ সালে বাড়ির আঙিনায় প্রতিষ্ঠিত হয় আঠারবাড়ী ডিগ্রি কলেজ। তবে রবীন্দ্র-স্মৃতিধন্য বাড়িটির অবস্থা আজ সংকটাপন্ন — সংস্কারের দাবি দীর্ঘদিনের, প্রশাসন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানের জন্য আবেদন করলেও কাজের অগ্রগতি ধীর (দ্য ডেইলি স্টার)।
ভ্রমণ তথ্য
যাওয়া: ময়মনসিংহ শহর থেকে উত্তরে বাস/ট্রেনে গৌরীপুর (গৌরীপুর জংশন স্টেশনও ব্যবহার করা যায়); রামগোপালপুর শহর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দক্ষিণে। আঠারবাড়ি যাওয়ার পথ ঈশ্বরগঞ্জ হয়ে — উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার। মনোযোগ: গৌরীপুর রাজবাড়ির বড় অংশ এখন কলেজ ক্যাম্পাস, লাহিড়ী লজ সরকারি অফিস, গৌরীপুর লজ ব্যাংকের ব্যক্তিগত সম্পত্তি — ভেতরে ঢোকার আগে অনুমতি নিন; বাইরে থেকে দেখা ও ছবি তোলাই বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। সময়: শীতের দিনে আরামদায়ক; দুটি জায়গা একদিনে দেখতে গেলে সকাল থেকে শুরু করুন। ময়মনসিংহের অন্য জমিদার-কীর্তি শশী লজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে জেলার জমিদার-মানচিত্রটা সম্পূর্ণ হয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
গৌরীপুর এস্টেট কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৭৭০ সালে, যুগলকিশোর রায় চৌধুরীর হাতে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
রামগোপালপুর বাড়ি কারা প্রতিষ্ঠা করেন?
দুই বিধবা জমিদার — রত্নমালা ও নারায়ণী দেবী; মামলায় জয়ী হয়ে পাওয়া তরফ রায়ের অংশ থেকে, ১৭৭৭ সালের দিকে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
গৌরীপুর রাজবাড়ি এখন কী?
বড় অংশে গৌরীপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজ (১৯৮১); দুর্গাবাড়ি মন্দির ও প্রায় ১০০ ফুট ফটকসহ কয়েকটি স্থাপনা টিকে আছে (দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট)।
গৌরীপুর লজে কি ঢোকা যায়?
সাধারণত নয় — এটি ব্যাংকের সম্পত্তি, গেস্ট হাউস হিসেবে ব্যবহৃত; প্রত্নতাত্ত্বিক তালিকাভুক্তও নয় (দ্য ডেইলি স্টার, জুন ২০২৬)।
আঠারবাড়ি নাম কেন?
জমিদার দ্বীপ রায় চৌধুরীর নিয়ে আসা আঠারটি পরিবারের বসতি থেকে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
রবীন্দ্রনাথ আঠারবাড়ি কবে আসেন?
১৯২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি, ছাত্র-জমিদার প্রমোদ চন্দ্র রায় চৌধুরীর আমন্ত্রণে (দ্য ডেইলি স্টার)।
শেষকথা
এক জমিদার বাড়ি কলেজের শ্রেণিকক্ষে, আরেকটি ব্যাংকের গেস্ট হাউসে, তৃতীয়টি রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি নিয়ে ধুঁকছে — গৌরীপুর-আঠারবাড়ি তাই জমিদারি ঐতিহ্যের জীবিত যাদুঘর নয়, বরং প্রশ্ন: আমরা এই উত্তরাধিকার দিয়ে আসলে কী করতে চাই? ভ্রমণকারী হিসেবে অন্তত দেখে আসাটা সেই প্রশ্নের প্রথম ধাপ। ময়মনসিংহ জেলার পর্ব এখানেই শেষ — এবার পালা জামালপুরের।