মধুটিলা ইকোপার্কের মতোই নালিতাবাড়ীর উত্তরে আরও দুটি ঠিকানা একই সফরে মিলিয়ে নেওয়া যায়: প্রকৃতির কাঁচা সৌন্দর্যের পানিহাটা-তারানি পাহাড় আর অর্থনীতির পাঠশালা নাকুগাঁও স্থলবন্দর। দুটোর অবস্থান কাছাকাছি — নালিতাবাড়ী শহর থেকে উত্তরের একই পথে। একটি চোখের আরাম, অন্যটি মনের প্রশ্ন।
পানিহাটা-তারানি: নদী, পাহাড়, বন, ঝরনা
নালিতাবাড়ীর সীমান্তবর্তী রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নে গারো পাহাড়ের এই অংশটির প্রশংসা ভ্রমণ-বিবরণে এক লাইনে এসেছে — "নদী, পাহাড়, বন, ঝরনা — এই চারে অপরূপা পানিহাটা"। তুরার অববাহিকা থেকে নেমে পশ্চিমে বয়ে গেছে পাহাড়ি ভোগাই নদী: এতটাই স্বচ্ছ তার জল যে রোদে নিচের নুড়ি পাথর ঝিকমিক করে; পাশে শত ফুট উঁচু সবুজে মোড়া পাহাড়। উত্তরে তাকালে মেঘ-কুয়াশার আবছা আবরণে ভারতের তুরা পাহাড় — দূরের টিলাগুলো যেন মেঘের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে (আদার ব্যাপারী; ভ্রমণ গাইড)। মাত্র শত গজ দূরে ভারতের আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে মালবাহী ট্রাক ছুটে চলতে দেখা যায়। ধারে আছে খ্রিস্টান উপাসনালয়, ছোট চিকিৎসা কেন্দ্র, পানিহাটা পাদ্রি মিশন ও শিক্ষার্থীদের হোস্টেল। জায়গাটি এখনো অবকাঠামোহীন প্রাকৃতিক স্পট — থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা নেই; জেলার পাহাড়ি স্পটগুলোতে রাতযাপনের সুযোগ না থাকায় সন্ধ্যার আগেই ফিরতে হয় (প্রথম আলো, সেপ্টেম্বর ২০২৫)। দূরত্বে সূত্রভেদ আছে: নালিতাবাড়ী থেকে প্রায় ১৩–১৯ কিলোমিটার, শেরপুর শহর থেকে ২১–২৫ কিলোমিটার।
নাকুগাঁও স্থলবন্দর: সম্ভাবনা বনাম বাস্তবতা
পানিহাটার পথে পড়ে নাকুগাঁও স্থলবন্দর — ১৯৯৬–৯৭ সালে শুল্ক স্টেশন দিয়ে শুরু, ২০১০ সালে স্থলবন্দর ঘোষণা এবং ১৮ জুন ২০১৫ থেকে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের অধীনে কার্যক্রম (বাংলা উইকিপিডিয়া)। ১৩.৪৬ একর জমিতে (প্রায় ১৬ কোটি টাকায় অবকাঠামো) ৪০০ টন ধারণক্ষমতার গুদাম, ওজনস্কেল, গাড়ি পার্কিং, ডরমিটরি সবই আছে; ওপারে মেঘালয়ের ডালু কাস্টমস স্টেশন (বারাঙ্গাপাড়া)। এখানে ইমিগ্রেশনও চালু — ভিসা থাকলে যাত্রী পারাপার সম্ভব (দ্য ডেইলি স্টার)। অনুমতির তালিকায় আছে পাথর, কয়লা, চুনাপাথর, চায়না ক্লে, কাঠ, সার, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ফল, গম, কোয়ার্টজসহ ২১ ধরনের পণ্য, এমনকি ভুটানের পণ্যও। কিন্তু বাস্তবতা হতাশার: দশ বছরে আমদানি হয়েছে কার্যত শুধু পাথর — ভারত বাকি ২০টি পণ্যের আমদানি চালু করেনি (দ্য ডেইলি স্টার, ১১ অক্টোবর ২০২৬)। পাথর আমদানির হিসাবও ওঠানামার: ২০১৯–২০ অর্থবছরে ৮৫ হাজার টন থেকে বেড়ে ২০২৩–২৪-এ সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৯১ হাজার টন, কিন্তু ২০২৫–২৬-এ নেমে ১ লাখ ৯৫ হাজার টন (স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ)। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ভারতীয় অংশে চাঁদাবাজিতে পাথরের দাম বাড়ছে; সমিতির ২৫০ সদস্যের মধ্যে সক্রিয় মাত্র ~৩৫ জন, আর প্রায় ৫,০০০ শ্রমিক কর্মহীন (ডেইলি স্টার; ব্যবসায়ী-সূত্র)। বন্দর এলাকাটি 'দেখার' জায়গা নয় — তবে বাংলাদেশের সীমান্ত-বাণিজ্যের বাস্তবতা বুঝতে এই নীরব চত্বরটা অনেক কথাই বলে।
ভ্রমণ তথ্য
যাওয়া: নালিতাবাড়ীর গড়কান্দা চৌরাস্তা থেকে উত্তরে নাকুগাঁওয়ের দিকে এগিয়ে পূর্বে মোড় — ভোগাই ব্রিজ পেরিয়ে ~৩ কিলোমিটার গেলে চায়না মোড়, সেখান থেকে উত্তরে ~১ কিলোমিটারেই পানিহাটা-তারানির মূল পয়েন্ট (ভ্রমণ গাইড)। ঢাকা থেকে মহাখালীর বাসে নকলা হয়ে নালিতাবাড়ী যাওয়াই সুবিধাজনক (আদার ব্যাপারী)। থাকা: স্পটে কিছু নেই — নালিতাবাড়ী বা শেরপুর শহরের হোটেলে থাকুন; দিনের ভ্রমণে সন্ধ্যার আগেই ফিরুন। পাশের গজনী ও মধুটিলার সঙ্গে মিলিয়ে দুই দিনের সীমান্ত-সার্কিট সাজানো যায়। সতর্কতা: এটি সক্রিয় সীমান্ত — বিজিবির নির্দেশনা মানুন, সীমান্ত পিলারের ধারে বা ভারতীয় রাস্তার দিকে এগোবেন না, বন্দর এলাকায় অনুমতি ছাড়া ছবি তুলবেন না। কখন: শীতকালে ভোগাইয়ের জল সবচেয়ে স্বচ্ছ, তুরা পাহাড়ের দৃশ্য পরিষ্কার।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
পানিহাটা-তারানি কোথায়?
নালিতাবাড়ীর রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নে, গারো পাহাড়ের সীমান্তবর্তী এলাকায় (আদার ব্যাপারী)।
ওখানে কী দেখব?
ভোগাই নদীর স্বচ্ছ জল, তুরা পাহাড়ের মেঘমাখা দৃশ্য, পাহাড়-বন আর পাদ্রি মিশন (ভ্রমণ গাইড)।
নাকুগাঁও বন্দর কবে চালু হয়?
স্থলবন্দর ঘোষণা ২০১০ সালে; কার্যক্রম শুরু ১৮ জুন ২০১৫ (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
বন্দর দিয়ে এখন কী আমদানি হয়?
কার্যত শুধু পাথর — অনুমোদিত ২১ পণ্যের বাকিগুলো ভারত চালু করেনি (দ্য ডেইলি স্টার, অক্টোবর ২০২৬)।
এই সীমান্ত দিয়ে ভারত যাওয়া যায় কি?
ইমিগ্রেশন চালু আছে — বৈধ ভিসা থাকলে যাত্রী পারাপার সম্ভব (দ্য ডেইলি স্টার)।
থাকার ব্যবস্থা আছে কি?
স্পটে নেই — নালিতাবাড়ী বা শেরপুর শহরে থাকতে হয় (প্রথম আলো)।
শেষকথা
পানিহাটা-তারানি আর নাকুগাঁও একই মুদ্রার দুই পিঠ: একদিকে প্রকৃতির অকৃপণ দান, অন্যদিকে সেই দানের অর্থনৈতিক সুযোগ কাজে লাগাতে না পারার হতাশা। সীমান্তের এই প্রান্তে একদিন কাটিয়ে গেলে শেরপুরের গল্পটা শুধু 'সুন্দর' থাকে না — 'সম্পূর্ণ' হয়।