নীলফামারীর ডোমার উপজেলার শেষ প্রান্তে ছোট্ট স্টেশন চিলাহাটি — অথচ এই স্টেশনের নাম জানে দুই দেশের রেল মন্ত্রণালয়। কারণ এখান দিয়েই ফিরে এসেছে ৫৫ বছর ধরে মরে থাকা এক আন্তর্জাতিক রেলপথ, আবার এখান দিয়েই থমকে আছে দুই দেশের তৃতীয় যাত্রীবাহী ট্রেনের ভাগ্য। সেই সঙ্গে ডোমারের নিজের গল্প — প্রাচীন দুর্গ, তেভাগার মাটি আর বিখ্যাত সন্দেশ।
দার্জিলিং মেইলের পথ
ব্রিটিশ আমলে চিলাহাটি–হলদিবাড়ি ছিল কলকাতা–শিলিগুড়ি ব্রডগেজ মূল পথের অংশ; এই লাইন ধরেই চলত ঐতিহ্যবাহী দার্জিলিং মেইল, আর খুলনা হয়ে দার্জিলিং–কলকাতা ট্রেন চলাচল ছিল নিয়মিত ব্যাপার (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)। দেশভাগের পরও ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত এই পথে যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন চলেছে; ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে সংযোগটি ছিন্ন হয়ে যায় (একাধিক সূত্র)। এরপর পাঁচ দশকের বেশি সময় স্টেশনটি ছিল শুধুই একটি অভ্যন্তরীণ লাইনের শেষ স্টেশন।
২০২০: পঞ্চম সংযোগের প্রত্যাবর্তন
২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ভার্চুয়াল শীর্ষ বৈঠকে চিলাহাটি–হলদিবাড়ি রেলসংযোগ উদ্বোধন করেন — সেদিনই একটি মালবাহী ট্রেন সীমান্ত পেরিয়ে হলদিবাড়ি যায় (দ্য টেলিগ্রাফ; ওয়াইয়োনিউজ)। এটি ছিল পুনরুদ্ধার হওয়া পঞ্চম প্রাক-১৯৬৫ রেলসংযোগ। বাংলাদেশ অংশে চিলাহাটি স্টেশন থেকে সীমান্ত পর্যন্ত ৬.৭২৪ কিলোমিটার নতুন ব্রডগেজ লাইন ও ২.৩৬ কিলোমিটার লুপ লাইন নির্মাণ করা হয়, ব্যয় প্রায় ৮০ কোটি টাকা (ভারতীয় সংবাদসূত্র); স্টেশন থেকে জিরো পয়েন্টের দূরত্ব প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার। নিয়মিত মালবাহী চলাচল শুরু হয় ২০২১ সালের ১ আগস্ট থেকে (স্বরাজ্য; ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস)।
মিতালী এক্সপ্রেস: চালু, তারপর দীর্ঘ স্থগিতাদেশ
এই পথের যাত্রীবাহী ট্রেন মিতালী এক্সপ্রেস (ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট–নিউ জলপাইগুড়ি, মোট প্রায় ৪৯৫ কিলোমিটার) ঘোষণা হয় ২০২১ সালের মার্চে, আর প্রকৃত চলাচল শুরু হয় ২০২২ সালের ১ জুন — ৫৭ বছর পর এই রুটে প্রথম যাত্রীবাহী ট্রেন (নিউ এজ; ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)। কিন্তু বর্তমান অবস্থা জানা জরুরি: ২০২৪ সালের জুলাই থেকে মৈত্রী ও বন্ধন এক্সপ্রেসের সঙ্গে মিতালী এক্সপ্রেসও অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত — শেষ যাত্রাটি ছিল ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই (ঢাকা ট্রিবিউন; ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ইন্ডিয়া)। মালবাহী ট্রেন ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে আবার চললেও যাত্রীবাহী সেবা ফেরেনি; ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় দুই দেশের রেল বৈঠকে তিনটি ট্রেনই পুনরায় চালুর আলোচনা হয়েছে, তবে অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আসেনি (একাত্তর টিভি)। অর্থাৎ মিতালীতে চড়ে ভারত যাওয়ার পরিকল্পনা এখন করা যাবে না — সর্বশেষ তথ্য যাচাই করে তবেই সিদ্ধান্ত নিন।
ডোমার: দুর্গ, তেভাগা আর সন্দেশ
চিলাহাটি যে উপজেলায়, সেই ডোমারের থানা গঠিত হয় ১৮৭৫ সালে, উপজেলা হয় ১৯৮৪ সালে (বাংলাপিডিয়া)। উপজেলার প্রাচীন নিদর্শনের তালিকায় আছে হরিণচড়ার ময়নামতি দুর্গ ও সোনারায়ে শাহ কলন্দরের মাজার (বাংলাপিডিয়া) — দুর্গটির বিস্তারিত নথি কম, মাটির প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষই মূল আকর্ষণ। ১৯৪০-এর দশকের ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন ডোমার ও পাশের ডিমলা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল (সববাংলায়)। যমুনেশ্বরী, বুড়ি তিস্তা ও দেওনাই নদীর এই উপজেলা খাবারের জন্যও পরিচিত — ডোমারের সন্দেশ জেলাজুড়ে খ্যাতি পেয়েছে, দেশের বাইরেও এর নাম গেছে বলে স্থানীয়দের দাবি। প্রতিবেশী সৈয়দপুরের কারখানা আর নীলসাগর মিলিয়ে ডোমার-চিলাহাটি এই জেলার ভ্রমণের শেষ টুকরোটি জোড়া দেয়।
ভ্রমণ তথ্য
যাওয়া: ঢাকা থেকে নীলসাগর এক্সপ্রেসসহ আন্তঃনগর ট্রেন চিলাহাটি পর্যন্ত যায়; সৈয়দপুর বা নীলফামারী শহর থেকেও সড়কে আসা যায়। দেখবেন: চিলাহাটি স্টেশন ও সীমান্তমুখী লাইন (দূর থেকে), ডোমার শহর, ময়নামতি দুর্গ এলাকা, সন্দেশের দোকান। সতর্কতা: এটি সক্রিয় সীমান্ত এলাকা — জিরো পয়েন্টের দিকে অনুমতি ছাড়া যাওয়া যাবে না, বিজিবির নির্দেশনা মানুন; ছবি তোলার ক্ষেত্রেও সীমান্ত এলাকায় সংবেদনশীল হোন। আন্তঃদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেন বর্তমানে বন্ধ — পুরোনো ব্লগ বা ভিডিওর তথ্যে ভরসা না করে রেলওয়ের হালনাগাদ ঘোষণা দেখুন। থাকা-খাওয়া: ডোমারে সীমিত ব্যবস্থা; ভালো হোটেলের জন্য সৈয়দপুর বা নীলফামারী শহর বেছে নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
চিলাহাটি–হলদিবাড়ি রেলপথ কবে বন্ধ হয়েছিল, কবে ফের চালু হয়?
১৯৬৫ সালের যুদ্ধে বন্ধ হয়; ২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর পুনরায় উদ্বোধন হয়, নিয়মিত মালবাহী চলাচল শুরু ২০২১ সালের আগস্ট থেকে (ওয়াইয়োনিউজ; ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস)।
মিতালী এক্সপ্রেস কি এখন চলছে?
না — ২০২৪ সালের জুলাই থেকে স্থগিত। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে পুনরায় চালুর আলোচনা হলেও সিদ্ধান্ত হয়নি (একাত্তর টিভি; ঢাকা ট্রিবিউন)।
চিলাহাটি কোন উপজেলায়?
নীলফামারীর ডোমার উপজেলায়; স্টেশন থেকে সীমান্তের জিরো পয়েন্ট প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার।
ডোমারে কী দেখার আছে?
হরিণচড়ার ময়নামতি দুর্গ, সোনারায়ে শাহ কলন্দরের মাজার (বাংলাপিডিয়া), আর বিখ্যাত ডোমারের সন্দেশ।
সীমান্ত পর্যন্ত যাওয়া যাবে কি?
না — অনুমতি ছাড়া জিরো পয়েন্ট এলাকায় যাওয়া নিষেধ; স্টেশন ও শহর এলাকাই দর্শনার্থীদের জন্য।
শেষকথা
চিলাহাটি শেখায় — মানচিত্রের রেখা বদলালেও রেললাইনের স্মৃতি মরে না। অর্ধশতক পর ফিরে আসা এই পথ আবার কবে যাত্রী নেবে, তা সময়ই বলবে; ততদিন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে সেই অপেক্ষার গল্পটাই এখানকার আসল দর্শনীয়।