• 01 Nov, 2026

কারমাইকেল কলেজ ও পায়রাবন্দ ভ্রমণ গাইড — ১৯১৬ সালের কলেজ প্রতিষ্ঠার গল্প, ইন্দো-সারাসেনিক প্রধান ভবন, আর মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দে বেগম রোকেয়ার জন্মভিটা ও স্মৃতিকেন্দ্রের বর্তমান অবস্থা।

রংপুরের শিক্ষা-ঐতিহ্যের দুই প্রান্তে দুই নাম: শহরের দক্ষিণে লালবাগে কারমাইকেল কলেজ — যাকে বলা হয় "উত্তরবঙ্গের অক্সফোর্ড", আর মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দ গ্রাম — নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জন্মভিটা। প্রথমটি আজও প্রাণবন্ত ক্যাম্পাস, দ্বিতীয়টির গল্পে আছে গৌরবের পাশাপাশি অবহেলার সৎ স্বীকারোক্তিও।

কারমাইকেল কলেজ: জমিদারদের দানে গড়া কলেজ

১৯১৩ সালে গভর্নর লর্ড কারমাইকেল রংপুরে এলে নাগরিক সংবর্ধনায় এ অঞ্চলে প্রথম শ্রেণির কলেজের দাবি ওঠে; কালেক্টর জে. এন. গুপ্ত তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নেন (বাংলা ট্রিবিউন)। কুণ্ডি, কাশিমবাজার, রাধাবল্লভসহ বহু এলাকার জমিদার জমি ও অর্থ দান করেন — উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিলেন তাজহাটেরগোপাল লাল রায়ও (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। সভায় ঘটে বিখ্যাত "শূন্য বিভ্রাট": টেপার জমিদার অন্নদা মোহন রায় চৌধুরী ভুল বোঝাবুঝিতে এক লক্ষ টাকা দান ঘোষণা করেন — সেই দানের স্মৃতিতেই কলেজে "অন্নদা মোহন হল" (কলেজের ওয়েবসাইট)। ১৯১৬ সালের ১০ নভেম্বর গভর্নর লর্ড থমাস ডেভিড ব্যারন কারমাইকেল নিজে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন, কলেজের নাম হয় তাঁর নামেই (কলেজ ওয়েবসাইট/যুগান্তর)।

৬১০ ফুটের প্রধান ভবন ও বিশাল ক্যাম্পাস

১৯১৮ সালে উদ্বোধন হওয়া প্রধান ভবনটি ৬১০ ফুট লম্বা ও ৬০ ফুট প্রশস্ত — ইন্দো-সারাসেনিক ও মুঘল রীতির মেলবন্ধন (কলেজ ওয়েবসাইট), ঢাকার কার্জন হলের মতোই ঔপনিবেশিক শিক্ষা-স্থাপত্যের নিদর্শন। ক্যাম্পাসের জমি নিয়ে সূত্রে ভিন্ন হিসাব আছে (কলেজ সূত্রে ২০৬ একর, অন্য বর্ণনায় প্রায় ৯০০ বিঘা); এই জমির একাংশেই পরে গড়ে ওঠে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (যুগান্তর/দেশ রূপান্তর)। ১৯১৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পাঠ শুরু, ১৯৬৩ সালে সরকারীকরণ, বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত; শিক্ষার্থী প্রায় ২৪–৩০ হাজার (কলেজ ওয়েবসাইট/বাংলা ট্রিবিউন)। গ্রন্থাগারে ৭০ হাজারের বেশি বই — শুরু হয়েছিল মাত্র ২৫০ বই দিয়ে (কলেজ ওয়েবসাইট)। প্রাক্তনদের মধ্যে শহীদ জননী জাহানারা ইমামসহ বহু বিশিষ্ট নাম (কলেজ ওয়েবসাইট)। সৎ নোট: ২০০১ ও ২০০৬ সালে কলেজটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করার আইন পাস হলেও তা কার্যকর হয়নি (দেশ রূপান্তর), আর আবাসন-শ্রেণিকক্ষ সংকট আজও আছে (যুগান্তর)। ক্যাম্পাসটি চলমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান — দর্শনার্থীরা কর্তৃপক্ষের নিয়ম মেনে ঘুরবেন।

পায়রাবন্দ: রোকেয়ার জন্মভিটা

মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর জমিদার জহিরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবেরের ঘরে জন্ম নেন রোকেয়া (সমকাল/বাসস)। রক্ষণশীল পরিবেশে গোপনে শিক্ষা নিয়ে তিনিই লেখেন "সুলতানার স্বপ্ন" (১৯০৫) — নারীবাদী কল্পসাহিত্যের ক্লাসিক, এছাড়া মতিচূর, পদ্মরাগ, অবরোধবাসিনী (বারসিক নিউজ)। ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলার "সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি" জরিপে তিনি হন ষষ্ঠ (বারসিক)। ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বরই — জন্মদিনেই — কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়; সমাধি কলকাতার সোদপুরে (পানিহাটি)। জন্ম ও মৃত্যুর এই একই তারিখেই পালিত হয় রোকেয়া দিবস (বাসস)।

স্মৃতিকেন্দ্র: যা আছে, আর যে সৎ নোটটা জরুরি

১৯৯৭ সালে পৈতৃক ভিটার পাশে প্রায় তিন একর জমিতে গড়ে ওঠে বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র (সমকাল) — মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে; ভেতরে গেস্ট হাউস, ডরমেটরি, গ্রন্থাগার, গবেষণা কক্ষ, সংগ্রহশালা, মিলনায়তন ও রোকেয়ার পিতলের ভাস্কর্য (ট্যুর টুডে/প্রতিদিনের সংবাদ)। কিন্তু সৎ চিত্রটি হলো: সমকাল, প্রতিদিনের সংবাদ ও বাসসের (ডিসেম্বর ২০২৫) প্রতিবেদনে কেন্দ্রটির কার্যক্রম প্রায় বন্ধ, ভবনগুলো তালাবদ্ধ ও জীর্ণ, আর পৈতৃক প্রায় ৩৫০ বিঘা জমি বেদখল হয়ে আছে বলে জানানো হয়েছে; ২০০৯–১০ সাল থেকে পরিবারের দাবি — সোদপুর থেকে তাঁর দেহাবশেষ পায়রাবন্দে আনার — তাতেও অগ্রগতি হয়নি (খোলা কাগজ/সমকাল)। তাই পায়রাবন্দ ভ্রমণের সেরা সময় ৯ ডিসেম্বর, রোকেয়া দিবস — সেদিন জেলা প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনে জায়গাটি প্রাণ ফিরে পায়, তিন দিনব্যাপী মেলাও বসে (বাসস/প্রতিদিনের সংবাদ)। অন্য সময় গেলে ভিটা ও ভাস্কর্য দেখা যাবে, তবে কেন্দ্রের ভেতরের সুবিধাগুলো বন্ধ পাওয়ার প্রস্তুতি রাখুন।

ভ্রমণ তথ্য

কারমাইকেল কলেজ শহরের লালবাগে (কেন্দ্র থেকে ~৪ কিমি দক্ষিণে); পায়রাবন্দ মিঠাপুকুরে, শহর থেকে বাস/অটোতে যাওয়া যায়। একদিনের ছন্দ: সকালে তাজহাট, দুপুরে কারমাইকেল ক্যাম্পাস, বিকেলে পায়রাবন্দ — অথবা রোকেয়া দিবসে সরাসরি পায়রাবন্দ।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

কারমাইকেল কলেজ কবে প্রতিষ্ঠিত?

১৯১৬ সালের ১০ নভেম্বর, গভর্নর লর্ড কারমাইকেলের ভিত্তিপ্রস্তরে (কলেজ ওয়েবসাইট)।

"অন্নদা মোহন হল" নামের গল্প কী?

দান-সভায় শূন্য-বিভ্রাটে জমিদার অন্নদা মোহন এক লক্ষ টাকা দান ঘোষণা করেন (কলেজ ওয়েবসাইট)।

রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যু কবে?

দুটোই ৯ ডিসেম্বর — জন্ম ১৮৮০ পায়রাবন্দে, মৃত্যু ১৯৩২ কলকাতায় (সমকাল/বাসস)।

স্মৃতিকেন্দ্রের অবস্থা কেমন?

প্রতিবেদন অনুযায়ী কার্যক্রম প্রায় বন্ধ ও ভবন জীর্ণ (বাসস, ডিসেম্বর ২০২৫) — রোকেয়া দিবসে যাওয়া সবচেয়ে ভালো।

রোকেয়ার সমাধি কোথায়?

কলকাতার সোদপুরে; পায়রাবন্দে আনার দাবি এখনো অপূর্ণ (খোলা কাগজ)।

শেষকথা

কারমাইকেলের ৬১০ ফুট ভবনে আজও হাজারো শিক্ষার্থীর পাঠ চলে, অথচ যাঁর নামে এই শহরে বিশ্ববিদ্যালয়, তাঁর নিজের জন্মভিটা লড়ছে অস্তিত্ব নিয়ে। দুটোই রংপুরের সত্য — আর দুটো দেখলেই এই জেলার শিক্ষা-ইতিহাসের পুরো ছবিটা মেলে।