• 01 Nov, 2026

তিস্তা ব্যারেজ ভ্রমণ গাইড — লালমনিরহাটের দোয়ানী ও নীলফামারীর ডালিয়ার মাঝে ৬১৫ মিটার ব্যারেজের ইতিহাস, ৪৪টি রেডিয়াল গেট, সেচ এলাকা, শীতের অতিথি পাখি, পলি-বন্যার বাস্তবতা ও তিস্তা মাস্টার প্ল্যানের সর্বশেষ অগ্রগতিসহ যাওয়ার তথ্য।

তিস্তা নদীর বুকে ৬১৫ মিটার দীর্ঘ কংক্রিটের প্রাচীর — এক পাড়ে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধার দোয়ানী, অন্য পাড়ে নীলফামারীর ডিমলার ডালিয়া। তিস্তা ব্যারেজ শুধু দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্পই নয়, উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে আলোচিত জল-অবকাঠামো — যেখানে প্রকৌশল, কৃষি আর ভূ-রাজনীতি একসঙ্গে দাঁড়িয়ে।

ব্যারেজের কাঠামো: সংখ্যায়

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ব্যারেজটিতে রয়েছে ৪৪টি রেডিয়াল গেট, পানি ছাড়ার ক্ষমতা প্রতি সেকেন্ডে ১২,৭৫০ ঘনমিটার। ডান পাড়ের ১১০ মিটার দীর্ঘ ক্যানেল হেড রেগুলেটর দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে ২৮০ ঘনমিটার পানি সেচ খালে ঢোকে। সঙ্গে আছে ৬১০ মিটার ফ্লাড বাইপাস, ২,৪৭০ মিটার ক্লোজার বাঁধ আর প্রায় ৮০ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। প্রকল্পের মোট উপকারভোগী এলাকা ৭,৫০,০০০ হেক্টর, যার মধ্যে সেচযোগ্য ৫,৪০,০০০ হেক্টর — বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর ও বগুড়ার সাতটি জেলাজুড়ে বিস্তৃত (বাংলাপিডিয়া)।

ইতিহাস: ১৯৩৭-এর পরিকল্পনা থেকে ১৯৯০-এর ব্যারেজ

তিস্তা থেকে সেচের ভাবনা ১৯৩০-এর দশকের — ১৯৩৭ সালে প্রথম পরিকল্পনা গৃহীত হয় (ভ্রমণ গাইডসমূহ)। ১৯৬০ সালে গড্ডিমারীতে ব্যারেজের সম্ভাব্যতা যাচাই হয়, পরে ডালিয়া সাইটের প্রস্তাব আসে; এরই মধ্যে ভারত উজানে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে গজলডোবায় নিজেদের ব্যারেজ বানিয়ে ফেলে (বাংলাপিডিয়া)। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নকশায় ১৯৭৯ সালে দোয়ানীতে মূল ব্যারেজের নির্মাণ শুরু হয়, শেষ হয় ১৯৯০ সালের আগস্টে; খাল ব্যবস্থার কাজ শেষ হয় ১৯৯৭–৯৮ সালে, আর প্রথম সেচ দেওয়া শুরু ১৯৯৩ সালে (বাংলাপিডিয়া)।

যা দেখবেন: জলরাশি, বনায়ন আর শীতের পাখি

ব্যারেজের উজানে বাঁধ-ঘেরা বিস্তীর্ণ জলরাশি, পাথর-বাঁধানো পাড়, সেচ বাইপাস খাল আর দুই পাড়ের সবুজ বনায়ন মিলে জায়গাটি লালমনিরহাটের অন্যতম জনপ্রিয় বেড়ানোর ঠিকানা; এলাকায় কয়েকটি পিকনিক স্পটও গড়ে উঠেছে (ভ্রমণ গাইডসমূহ)। শীতকালে প্রচুর অতিথি পাখি আসে — পাখি দেখতে চাইলে শীতই সেরা ঋতু। বর্ষায় গেট খোলা অবস্থায় পানির গর্জন অন্য রূপ দেখায়, তবে সেই সময়টাই আবার বন্যার (নিচের সতর্কতা দেখুন)। নদীপারের চরজীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চাইলে এই সার্কিটের জুটি হতে পারে গাইবান্ধার চরাঞ্চল।

দুই মুখের বাস্তবতা: শুকনোয় খরা, বর্ষায় বন্যা

ব্যারেজ নিয়ে তিস্তাপারের অভিযোগও দীর্ঘদিনের — স্থানীয়দের ভাষ্যে সেচের প্রতিশ্রুত সুবিধার পাশাপাশি এসেছে ভাঙন আর অনিয়মিত পানির দুর্ভোগ (ডেইলি সান)। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য উদ্ধৃত করে ডেইলি স্টার (জুলাই ২০২৬) জানাচ্ছে, উজান থেকে প্রতি বছর প্রায় ৫ কোটি ঘনমিটার পলি ও বালু এসে তিস্তার তলদেশ উঁচু করে ফেলেছে; বাংলাদেশ অংশে কখনো পূর্ণাঙ্গ ড্রেজিং হয়নি, ফলে শুকনো মৌসুমে নদী পাঁচ থেকে আটটি চ্যানেলে ভাগ হয়ে যায়, আবার বর্ষায় সামান্য পানি বাড়লেই তীর উপচে চর ও লোকালয় প্লাবিত হয়। ২০২৬ সালের জুনের বন্যায় গজলডোবার গেট খুলে দেওয়ার পর ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপৎসীমা ছাড়ায়, ব্যারেজের সব ৪৪টি গেট খুলে দিতে হয় এবং চার জেলায় অন্তত সাত হাজার চর-পরিবার পানিবন্দি হয় (বাসস, ২৩ জুন ২০২৬)। এর মধ্যেই আশার খবর: ৩০ জুন ২০২৬ সংসদে প্রধানমন্ত্রী তিস্তা মাস্টার প্ল্যান "যেকোনো মূল্যে" বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আর তার কয়েক দিন আগেই তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে ঢাকা-বেইজিং যৌথ সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে সম্মত হয়েছে (সংসদ লাইব্রেরির সংবাদ সারসংক্ষেপ)। উত্তরের আরেক তিস্তা-অববাহিকার জনপদ কুড়িগ্রামের চরজীবনও একই অনিশ্চয়তার সঙ্গী।

ভ্রমণ তথ্য

যাওয়া: লালমনিরহাট শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার, হাতীবান্ধা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার; নীলফামারী শহর থেকে প্রায় ৪৪ কিলোমিটার (ভ্রমণ গাইডসমূহের আনুমানিক হিসাব — পথে সময় হাতে রাখুন)। দুই দিক থেকেই বাস-অটোরিকশা-মোটরসাইকেলে যাওয়া যায়; ব্যারেজের পাশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেস্ট হাউস আছে, তবে থাকা সাধারণত পূর্ব-ব্যবস্থাপনা সাপেক্ষ। সতর্কতা: ব্যারেজ সচল জল-অবকাঠামো — গেট ও নিষিদ্ধ এলাকায় ওঠা যাবে না, কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মানুন। ব্যারেজের ওপর দিয়ে ভারী ট্রাক চলাচল করে (সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে নকশা-ধারণক্ষমতার বেশি ওজনের ট্রাক চলাচল ও ফাটলের পুরোনো খবর আছে) — হাঁটার সময় সতর্ক থাকুন। বর্ষায় বা বন্যা-সতর্কতার সময় ভ্রমণ এড়িয়ে চলুন; পানি বাড়লে এলাকা দ্রুত প্লাবিত হয়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

তিস্তা ব্যারেজ কোথায়?
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার দোয়ানীতে; ওপারে নীলফামারীর ডিমলার ডালিয়া (বাংলাপিডিয়া)।

ব্যারেজে কয়টি গেট আছে?
৪৪টি রেডিয়াল গেট (বাংলাপিডিয়া; বাসসের ২০২৬ সালের বন্যা-প্রতিবেদনেও ৪৪ গেটের উল্লেখ)।

প্রকল্পটি কত এলাকায় সেচ দেয়?
সেচযোগ্য এলাকা ৫,৪০,০০০ হেক্টর, সাত জেলাজুড়ে (বাংলাপিডিয়া)।

কবে নির্মাণ শেষ হয়?
মূল ব্যারেজ ১৯৯০ সালে; খাল ব্যবস্থা ১৯৯৭–৯৮ সালে; প্রথম সেচ ১৯৯৩ সালে (বাংলাপিডিয়া)।

ভ্রমণের সেরা সময় কখন?
শীতকাল — অতিথি পাখি ও শান্ত নদী; বর্ষায় বন্যার ঝুঁকি থাকে।

তিস্তা মাস্টার প্ল্যানের সর্বশেষ অবস্থা কী?
জুন ২০২৬-এ সংসদে প্রধানমন্ত্রী বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং চীনের সঙ্গে যৌথ সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে সমঝোতা হয়েছে (সংসদ লাইব্রেরির সংবাদ সারসংক্ষেপ)।

শেষকথা

তিস্তা ব্যারেজে দাঁড়ালে বোঝা যায়, উত্তরবঙ্গের কৃষি-ভাগ্য কেন এই একটা কংক্রিট কাঠামোর সঙ্গে এত গভীরভাবে বাঁধা। পিকনিকের আনন্দের পাশাপাশি পলি, ভাঙন আর পানিবণ্টনের প্রশ্নগুলোও জানা থাকলে এই ভ্রমণ শুধু দেখা নয়, বোঝাও হয়ে ওঠে।