• 31 Oct, 2026

রানীশংকৈল ও খুনিয়া দিঘি ভ্রমণ গাইড — রানী শংকরীর নামে উপজেলার নামকরণ, রাজা টংকনাথের মালদুয়ার রাজবাড়ির বর্তমান অবস্থা, খুনিয়া দিঘি বধ্যভূমির ইতিহাস ও স্মৃতিসৌধ, রামরাই দিঘির অতিথি পাখি এবং ভ্রমণ তথ্য।

ঠাকুরগাঁও শহরের পোস্টে পড়েছেন, টাঙ্গন নদীর নাম এসেছে এক জমিদারের নাম থেকে — সেই জমিদার টংকনাথের রাজধানীই ছিল রানীশংকৈল। জেলা সদর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের এই উপজেলায় একসঙ্গে মিলেছে রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ, মুক্তিযুদ্ধের এক মর্মান্তিক বধ্যভূমি, আর শীতে অতিথি পাখিতে ভরে ওঠা এক বিশাল দিঘি।

রানীশংকৈল নাম ও টংকনাথ: সেবায়েত থেকে রাজা

গল্পটা প্রায় রূপকথা: টংকনাথের পূর্বপুরুষদের কেউ জমিদার ছিলেন না। উপজেলা সদর থেকে ৭ কিলোমিটার পূর্বে কাটিহারে বাস করতেন গোয়ালা বংশীয় এক নিঃসন্তান জমিদার; তাঁর মন্দিরে সেবায়েত ছিলেন টংকনাথের পিতা বুদ্ধিনাথ। জমিদার কাশী যাওয়ার সময় তাম্রপাতে দলিল করে যান — ফিরে না এলে জমিদারির মালিক হবেন বুদ্ধিনাথ। তিনি আর ফিরে আসেননি (বাংলা উইকিপিডিয়া; কারও কারও মতে ঘটনাটি দু-এক পুরুষ আগেরও হতে পারে)। বুদ্ধিনাথের দ্বিতীয় ছেলে টংকনাথ গড়েন মালদুয়ার স্টেট; সমাজসেবার স্বীকৃতিতে ব্রিটিশ সরকার ১৯২৫ সালে তাঁকে "চৌধুরী" উপাধি দেয়, পরে দিনাজপুরের মহারাজা গিরিজনাথ রায়ের অধীনে তিনি পান "রাজা" উপাধি (বাংলা উইকিপিডিয়া)। স্ত্রী রাণী শংকরী দেবীর নামানুসারেই মালদুয়ার স্টেটের নতুন নাম হয় রাণীশংকৈল। দেশভাগের প্রাক্কালে পরিবারটি ভারতে পাড়ি জমালে এই জমিদারি-পরম্পরার সমাপ্তি ঘটে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী রানীশংকাইল থানা গঠিত হয় ১৮৩৭ সালে; উপজেলাটির নদী কুলিক, নাগর ও তিরনাই।

রাজবাড়ি আজ: সিংহদ্বার আর ধ্বংসাবশেষ

বাচোর ইউনিয়নে, কুলিক নদীর পাড়ে প্রায় ১১ একর জমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে রাজা টংকনাথের রাজবাড়ি — নির্মাণ ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে (সরকারি পর্যটন পোর্টাল "বিউটিফুল বাংলাদেশ"; বাংলা উইকিপিডিয়া)। অনেক অংশ এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত; পশ্চিম পাশে রয়েছে সিংহদ্বার, যার লোহার দরজার ওপরে দিকনির্দেশক চিহ্ন খোদাই করা; উত্তর-পূর্ব কোণে কাছারিবাড়ি, পূর্বে দুটি পুকুর (বিউটিফুল বাংলাদেশ)। রাজবাড়ি থেকে প্রায় ২০০ মিটার দক্ষিণে, সড়কের ওপারে কুলিকের পাড়ে রামচন্দ্র (জয়কালী) মন্দির — প্রাসাদের চেয়েও পুরোনো এই মন্দিরটি ১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর হাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এখন সম্পূর্ণ ধ্বংসাবশেষ (বিউটিফুল বাংলাদেশ)। বংশধরদের বিবরণে, ১৯৪৭ সালের ১৩ আগস্ট — দেশভাগের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে — প্রাসাদটি পরিত্যক্ত হয়। প্রত্যাশা সেই অনুযায়ী রাখুন: এটি জৌলুসের প্রাসাদ নয়, ইতিহাসের আবহে ভরা এক ধ্বংসস্তূপ — তবে টংকনাথের গল্প জানা থাকলে ভাঙা দেয়ালগুলোই কথা বলে।

খুনিয়া দিঘি: নামের পেছনের রক্তাক্ত ইতিহাস

উপজেলা সদরের সামান্য দক্ষিণে ভান্ডারা গ্রামে খুনিয়া দিঘি — আয়তন প্রায় ৬ একর; প্রায় দুই শ বছর আগে এক স্থানীয় জমিদার এটি খনন করান (বাংলা উইকিপিডিয়া)। নামের উৎসও অন্ধকার: নির্জন জঙ্গলঘেরা এই দিঘির পাশ দিয়ে রায়গঞ্জে বাণিজ্যে যেতেন ব্যবসায়ীরা; একবার এক ব্যবসায়ীকে খুন করে পাড়ে ফেলে রাখা হলে তখন থেকে নাম হয় "খুনিয়া" (বাংলা উইকিপিডিয়া)। কিন্তু নামটি চিরস্থায়ী হয় ১৯৭১-এ। রানীশংকৈলে ক্যাম্প বসিয়ে পাকবাহিনী ও তাদের সহযোগীরা এই দিঘির পাড়ে চালায় গণহত্যা — পাড়ের শিমুল গাছে পেরেক মেরে ঝুলিয়ে নির্যাতনের বর্ণনাও স্থানীয় ইতিহাসে আছে; নিহতদের মধ্যে ছিলেন নেকমরদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ডা. আব্দুর রহমান ও তাঁর ভাই (বাংলা উইকিপিডিয়া)। নিহতের সংখ্যা নিয়ে সূত্রে ভিন্নতা আছে — স্থানীয় ইতিহাসে হাজার থেকে কয়েক হাজার পর্যন্ত বলা হয়; বাংলাপিডিয়া শুধু বলে, খুনিয়া দিঘিতে একটি বধ্যভূমি চিহ্নিত হয়েছে (মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ২০২০-এর বরাতে)। স্বাধীনতার পর দিঘি থেকে উদ্ধার করা হাড়গোড় পাড়ে সমাহিত করে সেখানে নির্মিত হয় স্মৃতিসৌধ — ১৯৭৩ সালে সেটি উদ্বোধন করেন জাতীয় চার নেতার অন্যতম আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান (বাংলা উইকিপিডিয়া)। এটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বধ্যভূমি হিসেবে পরিচিত — ঘুরতে নয়, শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়ার জায়গা; ১৬ ডিসেম্বর ও ২৬ মার্চে এখানে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ হয়।

রামরাই দিঘি (রাণীসাগর): শীতের পাখির হ্রদ

মর্মান্তিক ইতিহাসের বিপরীতে উপজেলার প্রাণের জায়গাটি রামরাই দিঘি — রানীশংকৈল শহর থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে উত্তরগাঁও গ্রামে। পাড়সহ মোট আয়তন প্রায় ৪২.২ একর (জলাশয় ২৩.৮২ একর), দৈর্ঘ্য ৯০০ মিটার ও প্রস্থ ৪০০ মিটার — বরেন্দ্র অঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহত্তম জলাশয় (ইউএনবি; ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, দিঘিটির বয়স ৫০০ থেকে ১,০০০ বছরের মধ্যে; ২০০২ সালে এর নতুন নামকরণ হয় "রাণীসাগর", তবে সবাই চেনে রামরাই নামেই; চারপাশে রোপণ করা হয়েছে প্রায় ১,২০০ লিচু ও অন্যান্য গাছ (ইউএনবি)। প্রতি শীতে সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া ও তিব্বত মালভূমি থেকে হাজার হাজার অতিথি পাখি — সাদা বক, পানকৌড়ি, হাঁস জাতীয় নানা প্রজাতি — ভিড় করে এখানে; ভিড় সবচেয়ে বেশি ডিসেম্বরের শেষ থেকে জানুয়ারির শুরুতে (ইউএনবি, জানুয়ারি ২০২৫)। শীতের ভোরে গেলে পাখির কলরবে ভরা দিঘির পাড়ই রানীশংকৈল ভ্রমণের সেরা স্মৃতি হবে। পাশের বালিয়াডাঙ্গীর আধারদিঘির মতো এটিও গ্রামজীবনের কেন্দ্রে থাকা এক প্রাচীন জলাশয় — তবে মাপে ও পাখির খ্যাতিতে রামরাই অনেক এগিয়ে।

আরও যা আছে, আর ভ্রমণ তথ্য

আরও আছে: নেকমরদে পীর শাহ নাসিরউদ্দিনের (র.) মাজার ও ওরস মেলা, জগদলে রাজা বীরেন্দ্রনাথের রাজবাড়ি, গোরক্ষনাথ মন্দির, বাংলা গড়, রাণী দীঘি ও শিব দীঘি (বাংলাপিডিয়া)। যাওয়া: ঠাকুরগাঁও শহর থেকে বাসে রানীশংকৈল বাসস্ট্যান্ড, সেখান থেকে ভ্যান/মোটরসাইকেলে রাজবাড়ি (বিউটিফুল বাংলাদেশ); খুনিয়া দিঘি সদরের দক্ষিণে কাছেই; রামরাই দিঘি শহর থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার। সময়: পাখির জন্য ডিসেম্বর–জানুয়ারি; ইতিহাসের স্থানগুলো যেকোনো মৌসুমে। শিষ্টাচার: খুনিয়া দিঘি বধ্যভূমি — স্মৃতিসৌধে শান্ত ও শ্রদ্ধাশীল আচরণ করুন, এটি পিকনিকের জায়গা নয়। রামরাইয়ে পাখিদের বিরক্ত করবেন না, দূর থেকে দেখুন। থাকা-খাওয়া: রানীশংকৈলে সাধারণ মানের ব্যবস্থা; ভালো বিকল্পের জন্য ঠাকুরগাঁও শহরকে ঘাঁটি করুন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

রানীশংকৈল নাম কোথা থেকে এলো?

রাজা টংকনাথের স্ত্রী রাণী শংকরী দেবীর নামে — মালদুয়ার স্টেটের নাম বদলে হয় রাণীশংকৈল (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

টংকনাথ কীভাবে রাজা হলেন?

তাঁর পিতা বুদ্ধিনাথ মন্দিরের সেবায়েত থেকে তাম্রপাতের দলিলে জমিদারি পান; টংকনাথ মালদুয়ার স্টেট গড়ে ১৯২৫ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে "চৌধুরী", পরে "রাজা" উপাধি পান (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

খুনিয়া দিঘি কেন বিখ্যাত?

১৯৭১ সালে এখানে পাকবাহিনী গণহত্যা চালায় — এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ বধ্যভূমি; পাড়ে স্মৃতিসৌধ আছে, উদ্বোধন ১৯৭৩ সালে (বাংলা উইকিপিডিয়া; বাংলাপিডিয়া)।

রামরাই দিঘিতে পাখি কখন আসে?

শীতে, বিশেষ করে ডিসেম্বরের শেষ থেকে জানুয়ারির শুরুতে ভিড় সর্বোচ্চ (ইউএনবি)।

রাজবাড়ি কি অক্ষত আছে?

না — অনেক অংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত; সিংহদ্বার, কাছারিবাড়ি ও পুকুরের অবশিষ্টাংশ দেখা যায় (বিউটিফুল বাংলাদেশ)।

খুনিয়া দিঘি কোথায়?

রানীশংকৈলের ভান্ডারা গ্রামে, উপজেলা সদরের সামান্য দক্ষিণে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

শেষকথা

রানীশংকৈল একই জনপদে দেখায় ক্ষমতার উত্থান, স্বাধীনতার মূল্য আর প্রকৃতির ফিরে আসা — ধ্বংসস্তূপের প্রাসাদ, রক্তে ভেজা দিঘি, আর প্রতি শীতে পাখির ডানায় ভরে ওঠা আরেক দিঘি। ঠাকুরগাঁও জেলার ভ্রমণ এখানেই পূর্ণতা পায়।