পঞ্চগড়ের উত্তরে, ভারত সীমান্ত ঘেঁষে এমন এক নগরীর ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে আছে, যার পরিসীমা এত বড় যে মহাকাশ থেকে তোলা ছবিতেও তার বর্গাকার রূপরেখা ধরা পড়ে — ভিতরগড়। আর জেলার দক্ষিণে বোদায় আছে আরেক প্রাচীন জলাশয় কাজলদিঘী, যাকে ঘিরে লোককথা এখনো জীবন্ত। পঞ্চগড় শহরের নামের পাঁচ গড়ের সেরা নিদর্শন এই ভিতরগড় — প্রত্নতত্ত্বপ্রেমীর জন্য এই জেলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
ভিতরগড়: চার স্তরের প্রাচীরে ঘেরা নগররাষ্ট্র
সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নে, শহর থেকে প্রায় ১৫–১৬ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত ভিতরগড় প্রায় ২৫ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত — বাংলাদেশের বৃহত্তম দুর্গবদ্ধ বসতি (বাংলাপিডিয়া)। নগরীটি গড়া ছিল চারটি সমকেন্দ্রিক চতুর্ভুজ আবেষ্টনীতে: পোড়া ইট ও মাটির উঁচু প্রাচীর, নিয়মিত দূরত্বে বুরুজ, আর সবচেয়ে ভেতরেরটি ছাড়া প্রতিটির বাইরে প্রশস্ত পরিখা (প্রায় ৫০ ফুট চওড়া, ১০–১৫ ফুট গভীর — বুকানন হ্যামিল্টনের বর্ণনায়)। পশ্চিমে তালমা আর পূর্বে কুদুম নদী ছিল প্রাকৃতিক প্রহরী; নগরীর ভেতরে ছিল দশটি দিঘি (বাংলাপিডিয়া)। অবস্থানটাই ছিল সম্পদ: প্রাচীন স্থল ও নদীপথের মোড়ে — তিব্বত, নেপাল, ভুটান, আসাম-কোচবিহার আর মধ্য-নিম্ন গাঙ্গেয় উপত্যকার বাণিজ্যপথ মিলিত হতো এখানে (রাইজিং বিডি)। প্রথম লিখিত উল্লেখ মেলে মার্টিনের পূর্ব-ভারত বিষয়ক গ্রন্থে (১৮৩৮); বুকানন হ্যামিল্টন ঊনবিংশ শতকের শুরুতেই নগরীর কাঠামো বর্ণনা করে গেছেন (বাংলা উইকিপিডিয়া)। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অনুমতিতে ইউল্যাবের অধ্যাপক শাহনাজ হুসনে জাহানের নেতৃত্বে ২০০৮ সাল থেকে পরিচালিত জরিপ ও খননে (আগে ২০০৩ সালে অনুসন্ধান শুরু) সবচেয়ে ভেতরের আবেষ্টনীতে পাওয়া গেছে প্রায় ষষ্ঠ–সপ্তম শতকের একটি ক্রুশাকার মন্দির ও বৌদ্ধ স্তূপের ভিত্তি (ডেইলি স্টার ম্যাগাজিন); পরবর্তী খননে মোট নয়টি স্থাপনা — আটটি মন্দির ও একটি আবাসিক কমপ্লেক্স — এবং ষষ্ঠ থেকে দশম শতকের নানা নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে (ডেইলি স্টার, ২০১৬; রাইজিং বিডি)। গবেষক জাহানের সতর্ক প্রস্তাব: ষষ্ঠ থেকে দশম শতকের কোনো এক পর্বে ভিতরগড় ছিল সম্ভবত একটি স্বাধীন নগররাষ্ট্র — যদিও কোনো শিলালিপি বা লিখিত দলিল না থাকায় ইতিহাসের অনেকটাই এখনো ধারণানির্ভর। পঞ্চগড় জেলাতেই ৭৫০–১২০০ খ্রিষ্টাব্দের পর্বের এমন ১৬টি দুর্গনগরীর খোঁজ মিলেছে (গবেষণা প্রবন্ধ, ২০২৩) — ভিতরগড় তার সেরা।
পৃথু রাজা, কীচক আর কিংবদন্তির সীমানা
নগরীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নামটি পৃথু রাজা — স্থানীয়দের কাছে তিনি "মহারাজা"; কামরূপ বুরুঞ্জীতে রাজা জল্পেশ্বরকে পৃথু বলা হয়েছে (বাংলা উইকিপিডিয়া) এবং জনশ্রুতি ও প্রাচীন সূত্র মিলিয়ে তাঁকে কামরূপের রাজবংশের সঙ্গে যুক্ত করা হয় (পঞ্চগড় ইনফো)। কিংবদন্তি বলে: "কীচক" নামের এক জনগোষ্ঠীর আক্রমণে কোণঠাসা হয়ে পৃথু রাজা ধর্ম ও মর্যাদা রক্ষায় সৈন্যসামন্তসহ দিঘির জলে আত্মাহুতি দেন — বুকানন হ্যামিল্টন ঊনবিংশ শতকেই স্থানীয় হিন্দুদের মুখে এই বিশ্বাস লিপিবদ্ধ করেছিলেন (বাংলাপিডিয়া)। এটি ইতিহাস নয়, লোকস্মৃতি — কিন্তু সেই স্মৃতিই সহস্র বছর ধরে জায়গাটিকে পবিত্র করে রেখেছে (বাংলাপিডিয়া)। সুলতানি আমলের কোনো বসতির চিহ্ন খননে পাওয়া যায়নি (রাইজিং বিডি); সপ্তদশ শতক নাগাদ নগরী পরিত্যক্ত হয় বলে ধরা হয়। ১৯৪৭-এর দেশভাগে নগরীর উত্তর, উত্তর-পশ্চিম ও পূর্ব দিকের বাইরের আবেষ্টনীর অংশ পড়ে যায় ভারতের জলপাইগুড়ি জেলায় — ভিতরগড় আজ তাই একটি সীমান্ত-বিভক্ত প্রত্নস্থল (বাংলাপিডিয়া)। সাইটটি প্রত্নসম্পদ আইনে সংরক্ষিত ঘোষিত; তবে ভেতরে বসতি ও নির্মাণের চাপ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেদন হয়েছে — সংরক্ষণের লড়াইটা এখনো চলমান।
মহারাজার দিঘী: নগরীর টিকে থাকা হৃদয়
ভিতরগড়ের প্রায় সব স্থাপনা মাটির সঙ্গে মিশে গেলেও রয়ে গেছে এর বৃহত্তম জলাশয় — মহারাজার দিঘী। পাড়সহ আয়তন প্রায় ৫৩.৭৯ একর: উত্তর-দক্ষিণে দৈর্ঘ্য ৮০০ গজ, পূর্ব-পশ্চিমে প্রস্থ ৪০০ গজ; পাড়ের উচ্চতা প্রায় ২০ ফুট, খরা মৌসুমেও পানির গভীরতা ৪০–৫০ ফুট (বাংলা উইকিপিডিয়া; পঞ্চগড় ইনফো)। দিঘিটির রয়েছে ইট বাঁধানো ১০টি ঘাট, চারপাশে গাছগাছালির নিবিড় ছায়া। ধারণা করা হয়, দিঘি থেকে মাত্র ১৩৫ মিটার দূরেই ছিল পৃথু রাজার বাড়ি (বাংলা উইকিপিডিয়া)। প্রতি বছর পয়লা বৈশাখে দিঘির পাড়ে বসে বিশাল মেলা — পার্শ্ববর্তী ভারতের জেলাগুলো থেকেও আসেন দর্শনার্থী (বাংলা উইকিপিডিয়া)। আজ ভিতরগড়ে এলে সবচেয়ে জীবন্ত অভিজ্ঞতা এই দিঘির পাড়েই — কাছেই সমতলের চা বাগানগুলোর সবুজ, ফলে এক বেলায় প্রাচীন নগরী আর আধুনিক চা-অর্থনীতি পাশাপাশি দেখা হয়ে যায়।
কাজলদিঘী (বোদা): আরেক প্রাচীন দিঘির গল্প
কাজলদিঘী ভিতরগড়ের অংশ নয় — এটি বোদা উপজেলার কালিয়াগঞ্জ ইউনিয়নের প্রাচীন দিঘি; প্রায়শই দুটির নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হয় বলেই এই পোস্টে একসঙ্গে রাখা হলো। পাড়সহ আয়তন প্রায় ১৭ একর, দৈর্ঘ্য প্রায় ২৫০ মিটার ও প্রস্থ ২০০ মিটার — আকারে প্রায় বর্গাকার (বাংলা উইকিপিডিয়া)। দিঘিটি কবে, কে খনন করান, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না; লোককথায় দক্ষিণ পাড়ে এক রাজার বাস, অনাবৃষ্টির কালে সন্ন্যাসীর পরামর্শে দিঘি খনন আর পানি না ওঠার গল্প প্রচলিত আছে (বাংলা উইকিপিডিয়া)। পাকিস্তান আমলে পাড়ের জমিতে ভূমিহীন পরিবারদের আশ্রয় গড়ে ওঠে; বর্তমানে প্রায় অর্ধশত পরিবারের বসতি ঘিরে আছে দিঘিটিকে, দক্ষিণ-পশ্চিমে হাট-বাজার, পাড়ে কালিয়াগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (বাংলা উইকিপিডিয়া)। বিশালত্বে মহারাজার দিঘীর সঙ্গে তুলনা চলে না, তবে গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক নীরব প্রাচীন জলাশয় হিসেবে এর নিজস্ব মর্যাদা আছে।
দেখতে যাওয়া: বাস্তব প্রত্যাশা
ভিতরগড়ে যাওয়া: পঞ্চগড় শহর থেকে তেঁতুলিয়াগামী সড়কে বোর্ড বাজার/বোর্ড অফিস এলাকা থেকে পূর্বে প্রায় ৫ কিলোমিটার (ডেইলি স্টার ম্যাগাজিন) — স্থানীয় যান বা ভাড়ার গাড়িই সুবিধাজনক। প্রত্যাশা ঠিক রাখুন: উঁচু প্রাসাদ বা অক্ষত দেয়াল এখানে নেই; যা আছে তা হলো ঢিবি (মহারাজার ভিটা, কাছারিগড়ের নাম এখনো টিকে আছে), প্রাচীরের দীর্ঘ মাটির রেখা, পরিখার খাদ আর মহারাজার দিঘীর বিস্তার — প্রত্নতত্ত্বের কল্পনা যাঁর আছে, তাঁর কাছে এই "অদৃশ্য নগরী"ই মুগ্ধতা। কোনো জাদুঘর বা টিকিট-ব্যবস্থা সাইটে যাচাই করা যায়নি — গাইড নিলে স্থানীয় কারও সাহায্য নিন। সীমান্ত-সংলগ্ন এলাকা: বিজিবির নির্দেশনা মেনে চলুন, প্রত্নস্থলে খোঁড়াখুঁড়ি বা ইট সংগ্রহ আইনত নিষেধ। শীতের সকাল সেরা সময়; পয়লা বৈশাখের মেলা ধরতে পারলে অভিজ্ঞতা হবে অন্য রকম। কাজলদিঘী দেখতে হলে বোদা হয়ে আলাদা যাত্রা — একই দিনে শহরকে মাঝখানে রেখে উত্তর-দক্ষিণ দুই দিঘিই ঘোরার পরিকল্পনা করা যায়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ভিতরগড় কত পুরোনো?
মূল পর্ব ষষ্ঠ থেকে দশম শতক বলে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় ধারণা করা হয়; খননে ষষ্ঠ–সপ্তম শতকের মন্দির ও বৌদ্ধ স্তূপের ভিত্তি মিলেছে (ডেইলি স্টার)।
এটি কি সত্যিই দেশের বৃহত্তম প্রাচীন নগরী?
বাংলাপিডিয়ার মতে ভিতরগড় বাংলাদেশের বৃহত্তম দুর্গবদ্ধ বসতি (প্রায় ২৫ বর্গকিলোমিটার)।
পৃথু রাজা কি ঐতিহাসিক চরিত্র?
লিখিত দলিল মেলে না — তিনি মূলত জনশ্রুতি ও কামরূপ ঐতিহ্যের চরিত্র; কীচক-কিংবদন্তি বুকাননের লেখাতেই নথিভুক্ত (বাংলাপিডিয়া)।
মহারাজার দিঘীতে মেলা কবে বসে?
প্রতি বছর পয়লা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষের দিন (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
কাজলদিঘী কোথায়?
বোদা উপজেলার কালিয়াগঞ্জ ইউনিয়নে — ভিতরগড় থেকে আলাদা জায়গা; আয়তন প্রায় ১৭ একর (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
ভিতরগড়ে কী কী দেখা বাকি আছে?
ঢিবি, প্রাচীর-পরিখার রেখা আর মহারাজার দিঘী; স্থাপনা বলতে প্রায় কিছুই দাঁড়িয়ে নেই — এ তথ্য জেনেই যান।
শেষকথা
ভিতরগড় বাংলাদেশের সেই বিরল জায়গা, যেখানে ইতিহাস দেখতে হয় চোখে নয়, মনে — মাটির নিচে ঘুমিয়ে থাকা এক নগররাষ্ট্রের মানচিত্র পায়ের নিচে ছড়িয়ে থাকে। আর পাশের দিঘির পাড়ে পয়লা বৈশাখের মেলায় সেই হাজার বছরের স্মৃতি আজও মানুষের উৎসব হয়ে ফিরে আসে।