ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে গেলে "নলডাঙ্গা রাজবাড়ি" দেখতে চাইলে প্রথম সত্যিটা জেনে যাওয়া ভালো: রাজবাড়িটাই আর নেই। প্রাসাদের জায়গায় এখন ফসলের মাঠ, রাজাদের আসবাবপত্র অনেক আগেই নিলাম হয়ে গেছে (ডেইলি স্টার)। কিন্তু নলডাঙ্গা তবু ফাঁকা ঠিকানা নয় — বেগবতী নদীর তীরে সারি ধরে দাঁড়িয়ে আছে রাজবংশের গড়া আটটি প্রাচীন মন্দির, যার সবচেয়ে পুরনোটির বয়স সাড়ে তিন শ বছরের বেশি। একই উপজেলার বারোবাজারের সুলতানি মসজিদগুলোর মতো নলডাঙ্গাও তাই ঝিনাইদহের ঐতিহ্য-মানচিত্রের অনিবার্য নাম — শুধু এখানে ধর্মীয় স্থাপত্য হিন্দু রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতার।
তিন শ বছরের রাজবংশ, হারিয়ে যাওয়া প্রাসাদ
নলডাঙ্গায় প্রায় তিন শ বছর ধরে একের পর এক রাজা শাসন করেছেন (ডেইলি স্টার)। এই রাজবংশের শেষ দিকের উল্লেখযোগ্য নাম রাজা ইন্দু ভূষণ দেবরায় — ১৮৭০ সালে তাঁর মৃত্যুর পর রাজ্য পান দত্তক পুত্র রাজা বাহাদুর প্রমথ ভূষণ দেবরায়, যাঁর আমলেই মন্দির-প্রাঙ্গণের বেশিরভাগ নির্মাণ ও বিস্তার ঘটে বলে ধরা হয়। রাজত্বের অবসান ও সময়ের স্রোতে প্রাসাদটি সম্পূর্ণ বিলীন হয়; ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন (২০০৯) জানায়, প্রাসাদের ভূমিতে চাষাবাদ হয় এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংস্কার-উদ্যোগ না থাকায় স্থানটি বিস্মৃতির দিকে এগোচ্ছিল। কোনো কোনো ভ্রমণ-ওয়েবসাইটে রাজবাড়িকে "জাদুঘর" বলা হলেও তা সঠিক নয় — এখানে জাদুঘর নেই; যা আছে, তা মন্দিরগুলোই।
আটটি মন্দির: সিদ্ধেশ্বরী (১৬৫৬) থেকে দ্বিতল বিষ্ণু মন্দির
প্রাঙ্গণের শুরু সিদ্ধেশ্বরী মন্দির দিয়ে — ১৬৫৬ সালে রাজবংশের প্রথম ভূষণ দেবরায় এটি প্রতিষ্ঠা করেন (বাংলা উইকিপিডিয়া); পরে ধারাবাহিক শাসকদের হাতে যুক্ত হয় বাকিগুলো: কালীমাতা, লক্ষ্মী, গণেশ, দুর্গা, তারামণি (তারা), বিষ্ণু ও রাজেশ্বরী — মোট আটটি, যার সাতটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে (ডেইলি স্টার)। সবচেয়ে নজরকাড়া দ্বিতলবিশিষ্ট বিষ্ণু মন্দির — উচ্চতায় প্রায় ৬০ ফুট, পূজা-রীতির কারণে এটি "পঞ্চ দেবতা মন্দির" নামেও পরিচিত; নিচতলায় শিবের প্রতিকৃতি রয়েছে। বাকি মন্দিরগুলোর উচ্চতা ৩৫–৪০ ফুট, দেয়াল সাড়ে তিন থেকে চার ফুট পুরু। নদীর পাড়ে সারিবদ্ধ এই মন্দিরগুলোর দৃশ্য যশোরের এগারো শিব মন্দিরের কথা মনে করিয়ে দেয় — দুটোই রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গড়া নদীতীরের মন্দির-নগরী। হিন্দু ধর্মীয় বড় উৎসবগুলো এখানে জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হয়, তখন প্রাঙ্গণে ভক্ত-দর্শনার্থীর বিশেষ ভিড় জমে।
রাজাদের আরেক উত্তরাধিকার: ভূষণ স্কুল
নলডাঙ্গা রাজবংশের সবচেয়ে জীবন্ত উত্তরাধিকার সম্ভবত একটি বিদ্যালয়। ১৮৬৯ সালে রাজা ইন্দু ভূষণ দেবরায় রাজবাড়িতেই প্রতিষ্ঠা করেন একটি মিডিল ইংলিশ স্কুল; ১৮৮২ সালে প্রমথ ভূষণ দেবরায় সেটিকে ইংলিশ হাই স্কুলে রূপ দেন — সেই প্রতিষ্ঠানই আজকের সরকারি নলডাঙ্গা ভূষণ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়, যা ১৯৩৫ সালে কালীগঞ্জ শহরে স্থানান্তরিত হয়ে আজও চলছে (বিদ্যালয়ের ইতিহাস, বাংলা উইকিপিডিয়া)। অর্থাৎ মন্দিরের পাশাপাশি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান গড়াও ছিল এই রাজবংশের ধারাবাহিক পৃষ্ঠপোষকতা — প্রাসাদ হারালেও সেই উত্তরাধিকার শহরের দৈনন্দিন জীবনে রয়ে গেছে।
বর্তমান অবস্থা ও পাশের রিসোর্ট
সংরক্ষণের চিত্র এখানেও মিশ্র, তবে আশার দিক আছে: অবহেলার মাত্রা বোঝা যায় একটি পুরনো হিসাবে — ২০০৬–০৭ অর্থবছরে জেলা পরিষদ সাতটি মন্দিরের সংস্কারের জন্য বরাদ্দ দিয়েছিল মাত্র ৬৫ হাজার টাকা (ডেইলি স্টার), আর সে সময় একটি মন্দির প্রায় মাটির নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিল। তবে ২০০৯ সালের "ধ্বংসের কিনারায়" চিত্রের পর বাংলা উইকিপিডিয়ার বর্তমান-অবস্থা অনুযায়ী কয়েক দফা সরকারি সংস্কারে মন্দিরগুলো এখন বেশ ভালো অবস্থায় আছে। তবু সতর্কতা জরুরি — বণিক বার্তার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ঝিনাইদহের ২১টি গেজেটভুক্ত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার (নলডাঙ্গা রাজবাড়ীসহ) সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে; অর্থাৎ যত্নের প্রয়োজন ফুরোয়নি। আধুনিক সংযোজন হিসেবে মন্দির-এলাকার পাশে, নলডাঙ্গা বাজারের দক্ষিণে গড়ে উঠেছে এনআরবি পার্ক অ্যান্ড রিসোর্ট (আগের নাম নলডাঙ্গা রাজবাড়ি রিসোর্ট) — জেলার জনপ্রিয় পিকনিক স্পট, যেখানে শিশুদের রাইড, প্যাডেল বোট, খেলার মাঠ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা আছে (ভ্রমণ-বর্ণনা অনুযায়ী; প্রবেশ ফি সামান্য হলেও হার বদলাতে পারে — পৌঁছে যাচাই করুন)। ফলে পারিবারিক সফরে ইতিহাস আর বিনোদন একসঙ্গে মেলে — সকালে মন্দির, দুপুরে রিসোর্টের পিকনিক।
কীভাবে যাবেন
নলডাঙ্গা ঝিনাইদহ জেলা শহর থেকে প্রায় ২০–২৫ কিলোমিটার দূরে, কালীগঞ্জ উপজেলায় — ঝিনাইদহ বা কালীগঞ্জ থেকে বাস/ইজিবাইকে নলডাঙ্গা বাজার, সেখান থেকে হেঁটে বা ভ্যানে বেগবতী নদীর তীরের মন্দির-প্রাঙ্গণ। কালীগঞ্জ সদর থেকে বারোবাজার একদিকে আর নলডাঙ্গা আরেকদিকে — একই দিনে দুটোই কভার করা সম্ভব, সঙ্গে মল্লিকপুরের বটগাছ ধরলে দিনটা বেশ ভরপুর হয়, ভোরে বেরোনোই ভালো। পূজা-উৎসবের দিনে প্রাঙ্গণে ভিড় থাকে; সাধারণ দিনে শান্ত পরিবেশে ধীরে ঘোরা যায়। থাকার ব্যবস্থা কালীগঞ্জ বা ঝিনাইদহ শহরে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
রাজবাড়ি কি এখনো আছে?
না — প্রাসাদটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে; জায়গাটিতে চাষাবাদ হয়। দেখার বিষয় রাজবংশের গড়া মন্দিরগুলো ও পাশের রিসোর্ট-এলাকা। কোনো জাদুঘর এখানে নেই।
মন্দির কয়টি ও সবচেয়ে পুরনো কোনটি?
মোট আটটি মন্দিরের নাম পাওয়া যায় (সিদ্ধেশ্বরী, কালীমাতা, লক্ষ্মী, গণেশ, দুর্গা, তারামণি, বিষ্ণু, রাজেশ্বরী); সাতটি এখনো দাঁড়িয়ে। সবচেয়ে পুরনো সিদ্ধেশ্বরী, ১৬৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত।
বিষ্ণু মন্দিরের বিশেষত্ব কী?
এটি দ্বিতলবিশিষ্ট, প্রায় ৬০ ফুট উঁচু — "পঞ্চ দেবতা মন্দির" নামেও পরিচিত; অন্য মন্দিরগুলো ৩৫–৪০ ফুট উঁচু।
রিসোর্টে কী কী আছে?
এনআরবি পার্ক অ্যান্ড রিসোর্টে পিকনিক স্পট, শিশুদের রাইড, প্যাডেল বোট, খেলার মাঠ প্রভৃতি — গ্রুপ পিকনিকের প্যাকেজও পাওয়া যায় বলে ভ্রমণ-বর্ণনায় এসেছে।
কখন গেলে ভালো?
সাধারণ দিনে শান্তভাবে ঘোরা যায়; দুর্গাপূজাসহ বড় হিন্দু উৎসবে প্রাঙ্গণে জাঁকজমক ও ভিড় থাকে — উৎসবের আবহ চাইলে সেই সময়ই সেরা।
শেষকথা
নলডাঙ্গা শেখায় ঐতিহ্য কখনো প্রাসাদের দেয়ালে থাকে না — থাকে মানুষের গড়া মন্দিরে, স্কুলে আর নদীর পাড়ের উৎসবে। প্রাসাদ হারিয়ে গেলেও আটটি মন্দির আর দেড় শ বছরের পুরনো একটি স্কুল মিলিয়ে রাজবংশটি এখনো এই জনপদের জীবনের অংশ। সংস্কারের সুবাতাস যেন টিকে থাকে — এটাই প্রত্যাশা।