• 01 Nov, 2026

পঞ্চদশ শতকের সুফি সাধক ও শাসক খান জাহান আলীর সমাধি সৌধ, পাশের মাজার মসজিদ, আর কালাপাহাড়-ধলাপাহাড়ের কিংবদন্তি নিয়ে বিখ্যাত ঠাকুর দীঘি — ইতিহাস, উরস, যাতায়াত, আর দিঘির কুমির নিয়ে সাম্প্রতিক সতর্কবার্তাসহ বাগেরহাটের পূর্ণ মাজার গাইড।

বাগেরহাট মানেই অনেকের চোখে শুধু ষাট গম্বুজ মসজিদ — কিন্তু এই মসজিদ-নগরীর প্রাণপুরুষের সমাধিটি অনেক পর্যটকের তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। খান জাহান আলী (রহ.) — পঞ্চদশ শতকের সুফি সাধক, শাসক ও নগর-পরিকল্পক — ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দে এখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত হন। তাঁর একগম্বুজ সমাধি সৌধ, গায়ে লাগা প্রাচীন মসজিদ, আর দক্ষিণে প্রায় দুই শ বিঘার বিশাল ঠাকুর দীঘি মিলিয়ে এই কমপ্লেক্সটি বাগেরহাটের সবচেয়ে জীবন্ত ঐতিহ্য-কেন্দ্র — যেখানে ইতিহাসের পাশাপাশি আজও প্রতিদিন ভক্তদের দোয়া-জিয়ারত চলছে। ষাট গম্বুজ মসজিদের গাইডটির সঙ্গে এই পোস্ট মিলিয়ে পড়লে খান জাহানের বাগেরহাটের পুরো ছবিটা পাওয়া যাবে।

যাঁর নামে এই নগরী

জনশ্রুতি আর ইতিহাস মিলিয়ে জানা যায়, খান জাহান আলী পঞ্চদশ শতকের শুরুতে এই অঞ্চলে আসেন — প্রথমে দিল্লি, পরে বাংলার সুলতানের কাছ থেকে সুন্দরবন-প্রান্তীয় এই এলাকার জায়গির পেয়ে তিনি গভীর বন কেটে মুসলিম বসতি গড়ে তোলেন, যার নাম হয় খলিফাতাবাদ — আজকের বাগেরহাটের প্রাচীন মসজিদ-নগরী। রাস্তা, দীঘি আর মসজিদে ভরপুর এই জনপদ গড়ার কৃতিত্ব তাঁর; অসংখ্য দীঘির মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাতগুলোর একটি এই ঠাকুর দীঘি, আর শহরে পানীয়জলের জন্য খনন করা ঘোড়া দীঘি থেকে আজও বাগেরহাট শহরে পানি সরবরাহ হয় বলে জানা যায়। তাঁর নির্মিত স্থাপনাসমূহ ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় স্থান পায়। ১৪৫৯ সালে মৃত্যুর পর ভক্তরা তাঁকে এখানেই সমাহিত করেন — ধারণা করা হয়, সমাধি সৌধটি তিনি নিজের জীবদ্দশাতেই তৈরি করে রেখেছিলেন।

সমাধি সৌধ ও পাশের মসজিদ

সমাধিটি একটি বর্গাকার, একগম্বুজবিশিষ্ট সৌধ — কাটা পাথরের মোটা দেয়াল আর সরল গম্ভীর গড়নই এর সৌন্দর্য, খান জাহানী স্থাপত্যশৈলীর চেনা চরিত্রের মতোই। ভেতরে খান জাহান আলীর কবর, গায়ে শিলালিপি; পরিবেশ সব সময় ভক্তদের আসা-যাওয়ায় প্রাণবন্ত। সৌধের ঠিক পশ্চিম পাশে একই শৈলীতে নির্মিত ছোট একগম্বুজ মাজার মসজিদ — ধারণা করা হয় এটিও তাঁর আমলেই তৈরি। আরেকটু পশ্চিমে ঠাকুর দীঘির পশ্চিম পাড়ে আছে জিন্দাপীর মসজিদ ও খান জাহানের অনুসারী জিন্দাপীরের সমাধি। অর্থাৎ এই এক চত্বরেই খান জাহানী যুগের তিনটি স্থাপনা পাশাপাশি দেখা যায়।

ঠাকুর দীঘি: দুই নামের গল্প

মাজারের দক্ষিণে প্রায় দুই শ বিঘাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিশাল দীঘিটি দুই নামে পরিচিত — খাঞ্জেলী দীঘি আর ঠাকুর দীঘি। 'ঠাকুর' নামটি নিয়ে একাধিক জনশ্রুতি আছে: কারও মতে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায় খান জাহানকে ভক্তিভরে 'ঠাকুর' বলে ডাকতেন বলেই এই নাম; আবার কারও মতে নামটি এসেছে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু পীর আলী মোহাম্মদ তাহেরের স্মৃতিতে — যিনি পূর্বে ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং যাঁকে খান জাহান আদর করে 'ঠাকুর' বলে সম্বোধন করতেন; তাঁর মাজারও এই কমপ্লেক্সের পাশেই। দীঘির প্রধান ঘাটটি প্রশস্ত, নারীদের জন্য আলাদা ঘাটের ব্যবস্থা আছে, আর এর পানি স্থানীয়দের কাছে সুপেয় বলে পরিচিত। সন্ধ্যের আলোয় এই দীঘির পাড় বাগেরহাটের সবচেয়ে মনোরম জায়গাগুলোর একটি।

কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং আজকের সতর্কবার্তা

এই দীঘির সবচেয়ে বিখ্যাত অধিবাসী ছিল দুটি মিঠাপানির কুমির — পুরুষ 'কালাপাহাড়' ও স্ত্রী 'ধলাপাহাড়'। ১৯১৪ সালে প্রকাশিত সতীশ চন্দ্র মিত্রের ইতিহাস গ্রন্থ অনুযায়ী, জনশ্রুতি বলে খান জাহান নিজে এই দীঘিতে কুমির ছেড়েছিলেন, আর সাড়ে ছয় শ বছর ধরে তাদের বংশধরেরা খাদেম-ভক্তদের যত্নে এখানে বেঁচে ছিল — ভক্তরা মানতের পশু-খাবার উৎসর্গ করতেন, খাদেমের ডাকে কুমির পাড়ে উঠে আসত। কিন্তু এই রোমান্টিক অধ্যায় এখন ইতিহাস: মূল বংশের শেষ কুমিরটি ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মারা যায়; পরে দীঘিতে ছাড়া কুমিরগুলোর মধ্যে এখন বেঁচে আছে মাত্র একটি। আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই কুমিরটিকে ঘিরে উদ্বেগজনক খবর এসেছে — পত্রিকার প্রতিবেদনে দীঘিতে প্রাণী টেনে নেওয়ার ঘটনা ও বড় দুর্ঘটনার খবর বেরিয়েছে, এবং জননিরাপত্তার স্বার্থে জেলা প্রশাসন এই একমাত্র কুমিরটিকে দীঘি থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। তাই স্পষ্ট করে বলা দরকার: দীঘির পানিতে নামা বা গোসল করা একেবারেই ঝুঁকিপূর্ণ — ঘাটে গেলেও পানির ধার ঘেঁষবেন না, শিশুদের হাত ধরে রাখুন, আর কুমিরকে খাবার ছুড়ে দেওয়ার পুরনো রীতিতে অংশ নেবেন না। (মারা যাওয়া কালাপাহাড়ের সংরক্ষিত দেহ ষাট গম্বুজ এলাকার জাদুঘরে রাখা আছে বলে জানা যায় — কুমিরের গল্পটা সেখানেই নিরাপদে দেখা ভালো।)

উরস ও ভক্তির পরিবেশ

খান জাহান আলীর মাজার স্রেফ ঐতিহাসিক স্থাপনা নয় — এটি জীবন্ত ধর্মীয় কেন্দ্র। প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্ত থেকে ভক্তরা জিয়ারতে আসেন, আর প্রতি বছর এখানে উরস ও মেলা বসে, তখন হাজারো মানুষে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। মাজার চত্বরে স্থানীয় কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানত ও তাবিজ বিক্রির নামে পর্যটক হয়রানির অভিযোগও পত্রিকায় এসেছে — তাই জিয়ারত করুন মন দিয়ে, কিন্তু জোর করে কিছু বিক্রির চেষ্টা দেখলে ভদ্রভাবে এড়িয়ে চলুন; দান-মানত সম্পূর্ণই নিজের ইচ্ছার বিষয়।

কীভাবে যাবেন, কীভাবে সাজাবেন দিনটি

মাজারটি বাগেরহাট শহরের কাছে, খান জাহান আলী সড়কের পাশে। খুলনা শহর থেকে বাগেরহাটগামী বাসে এসে শহরের কাছেই নেমে অটোরিকশায় সহজে পৌঁছানো যায়। বেশিরভাগ ভ্রমণকারী একই দিনে ষাট গম্বুজ মসজিদ, বাগেরহাট জাদুঘর আর এই মাজার — তিনটি মিলিয়ে ঘোরেন; স্থানীয় যানে জায়গাগুলোর দূরত্ব কম। মাজারে ঢোকার সময় মর্যাদাপূর্ণ পোশাক ও শান্ত আচরণ মনে রাখুন — এটি সক্রিয় ধর্মীয় স্থান। সকাল বা পড়ন্ত বিকেলের আলো দীঘির ছবির জন্য সবচেয়ে ভালো।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

খান জাহান আলীর মাজার কোথায়?

বাগেরহাট শহরের কাছে, খান জাহান আলী সড়কের পাশে — খুলনা থেকে বাগেরহাটগামী বাসপথে। সমাধি সৌধের পাশেই মাজার মসজিদ ও দক্ষিণে ঠাকুর দীঘি।

ঠাকুর দীঘিতে কি গোসল করা যায়?

না — দীঘিতে কুমির থাকায় পানিতে নামা ঝুঁকিপূর্ণ; সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রশাসন কুমিরটি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও জানিয়েছে। পাড় থেকে দীঘি দেখুন, পানিতে নামবেন না।

কালাপাহাড়-ধলাপাহাড়ের বংশধর কি এখনো আছে?

মূল বংশের শেষ কুমিরটি ২০১৫ সালে মারা গেছে। পরে ছাড়া কুমিরগুলোর মধ্যে বর্তমানে একটি বেঁচে আছে বলে প্রতিবেদনে এসেছে।

ষাট গম্বুজ মসজিদ আর মাজার কি একদিনে দেখা যায়?

যায় — দুটিই বাগেরহাট শহরের কাছাকাছি; স্থানীয় যানে এক দিনের রুটে জাদুঘরসহ তিনটি স্থানই ঘোরা যায়।

মাজারে ঢুকতে কি টিকিট লাগে?

মাজার জিয়ারতের জন্য সাধারণত টিকিটের প্রয়োজন হয় না; উরস-মেলার সময় ভিড় অনেক বেশি থাকে — সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা করুন।

শেষকথা

ষাট গম্বুজের মহিমা যে মানুষটির হাতে গড়া, তাঁর সমাধির পাশে দাঁড়ালে বাগেরহাটের ইতিহাস পূর্ণতা পায়। ঠাকুর দীঘির শান্ত পানি, সাড়ে ছয় শ বছরের কুমির-কিংবদন্তি আর জীবন্ত জিয়ারতের পরিবেশ — এই মাজার বাগেরহাট ভ্রমণের অপরিহার্য অধ্যায়, শুধু পানির ধারে সতর্কতাটুকু মনে রাখলেই হলো।