• 02 Nov, 2026

ঝিনাইদহের মহেশপুরে দুই বিখ্যাত ঠিকানা — খোর্দ খালিশপুর (বর্তমান হামিদনগর), বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহি হামিদুর রহমানের জন্মভূমি (জ. ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩, শহীদ মাত্র ১৮ বছরে); আর ২,৭৩৭ একরের দত্তনগর কৃষি খামার (১৯৪০, হেমেন্দ্র নাথ দত্ত), যাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের প্রস্তাব উঠেছে অক্টোবর ২০২৬-এ।

ঝিনাইদহের সীমান্ত-ঘেঁষা উপজেলা মহেশপুরে পাশাপাশি দুটি ঠিকানা ইতিহাসের দুই ভিন্ন অধ্যায় বহন করে। একটি গ্রাম — খোর্দ খালিশপুর, যেখানে জন্মেছিলেন সাত বীরশ্রেষ্ঠের সর্বকনিষ্ঠজন, সিপাহি হামিদুর রহমান; গ্রামটির নামই আজ তাঁর নামে, হামিদনগর। অন্যটি এক বিস্তীর্ণ কৃষি-প্রান্তর — দত্তনগর খামার, ২,৭৩৭ একরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম বীজ উৎপাদন খামার, যার বয়স স্বাধীন বাংলাদেশের চেয়েও বেশি। মহেশপুর সফরে এই দুটোই দেখা এই জেলার শ্রদ্ধা ও সবুজের জোড়া অভিজ্ঞতা।

খালিশপুর থেকে হামিদনগর: ১৮ বছরের বীরের বাড়ি

হামিদুর রহমানের জন্ম ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মহেশপুরের খোর্দ খালিশপুর গ্রামে — বাবা আক্কাস আলী মণ্ডল, মা মোসাম্মৎ কায়মুন্নেসা; সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড় (বার্ষিকী-প্রতিবেদনসমূহ, অক্টোবর ২০২৬)। অভাবের সংসারে শৈশব সহজ ছিল না: খালিশপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর স্থানীয় নাইট স্কুলে পড়া, পাশাপাশি পরিবারের কাজে হাত লাগানো। কৈশোরে বাবার ইচ্ছায় কিছুদিন মুজাহিদ বাহিনীতে থাকার পর যশোরের চৌগাছায় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মহড়া দেখে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন জাগে; ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে সৈনিক হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে প্রশিক্ষণে যোগ দেন (ষাটমাকণ্ঠের বার্ষিকী-প্রতিবেদন) — তাঁর অষ্টাদশ জন্মদিনেই। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সি কোম্পানির সদস্য হিসেবে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

ধলাইয়ের সেই ভোর: যা ঘটেছিল ২৮ অক্টোবর ১৯৭১-এ

১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর ভোরে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ধলাই সীমান্ত ফাঁড়ি দখলের অভিযানে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি ভারী মেশিনগান পোস্টের অবিরাম গুলিতে থমকে গিয়েছিল মুক্তিবাহিনীর অগ্রযাত্রা। হামিদুর রহমান গ্রেনেড হাতে একাকী এগিয়ে যান সেই পোস্টের দিকে — মেশিনগান পোস্টটি ধ্বংস করতে সফল হলেও শত্রুর গুলিতে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন তিনি, মাত্র ১৮ বছর বয়সে। সাত বীরশ্রেষ্ঠের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। প্রথমে ত্রিপুরায় দাফন করা হলেও ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে এনে ঢাকার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে পুনঃসমাহিত করা হয়। ধলাইয়ে তাঁর স্মৃতিতে গড়ে উঠেছে পূর্ণাঙ্গ বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতি কমপ্লেক্স — স্মৃতিসৌধ, জাদুঘর ও গ্রন্থাগারসহ। জন্মভূমি হামিদনগরে তেমন বড় কমপ্লেক্স নেই; এখানকার মূল্য গ্রামটির সাদামাটা ভিটে আর নামেই — জন্ম (২ ফেব্রুয়ারি) ও শাহাদাতবার্ষিকীতে (২৮ অক্টোবর) স্থানীয়ভাবে কর্মসূচি পালিত হয় (বার্ষিকী-প্রতিবেদন, অক্টোবর ২০২৬)। এই বিভাগের মাটিতে শুয়ে থাকা আরেক বীরশ্রেষ্ঠের গল্প পড়তে পারেন রূপসায় রুহুল আমিনের সমাধির গাইডে।

দত্তনগর: এক ঠিকাদারের সবজি খামার থেকে জাতীয় সম্পদ

মহেশপুরের আরেক প্রান্তে দত্তনগর কৃষি খামার — যার বিস্তার মহেশপুরের পাশাপাশি চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের অংশজুড়েও। প্রায় ১৯৪০ সালে ভারতীয় ঠিকাদার হেমেন্দ্র নাথ দত্ত প্রায় ৩,০০০ একর জমিতে একটি বিশাল সবজি খামার গড়ে তোলেন (বাংলা উইকিপিডিয়া)। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় তিনি কলকাতায় চলে গেলে ১৯৪৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার খামারটি অধিগ্রহণ করে কৃষি বিভাগের হাতে দেয়; ১৯৬২ সালে সম্পত্তি হস্তান্তরিত হয় কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) কাছে — সেই থেকে খামারটি মূলত বীজ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বর্তমান কাঠামোয় পাঁচটি উপ-খামার — গোকুলনগর (৫৭০ একর), পাথিলা (৬০৩), মথুরা (৪৯০), করিঞ্চা (৫৭০) ও কুশাডাঙ্গা (৪৮০) — মোট ২,৭৩৭ একর, যার প্রায় ২,৫০০ একর আবাদি। এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বীজ উৎপাদন খামার হিসেবে স্বীকৃত এই খামার থেকে আউশ, পাট, গম, ভুট্টা, আলুসহ নানা ফসলের বীজ দেশের কৃষকদের কাছে যায়, একসময় বিদেশেও রপ্তানি হতো (এশিয়ান এজ)। সেচের জন্য আছে ডজন ডজন নলকূপ ও পাকা ড্রেন; আগের হাতে-কাটা ফসল এখন বড় মেশিনে মাড়াই হয়, আর খামারে কাজ করেন প্রায় দেড় হাজার শ্রমিক।

নতুন অধ্যায়ের প্রস্তাব: কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (অক্টোবর ২০২৬)

দত্তনগরকে আন্তর্জাতিক মানের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবি স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের — ২০০৮ সালের দিকে সরকারি পরিকল্পনা জমি-জটিলতায় থেমে গিয়েছিল। চলতি মাসে (৮ অক্টোবর ২০২৬) বিষয়টি আবার সামনে এসেছে: অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ও কৃষি সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রস্তাবটি তুলে ধরেন; কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি সরকার সক্রিয় বিবেচনা করবে এবং সুবিধাজনক সময়ে তিনি এলাকাটি পরিদর্শনের আশ্বাস দিয়েছেন (দৈনিক গঞ্জের খবর/দৈনিক লিখনী সংবাদ)। বাস্তবায়ন হলে দত্তনগর হবে কৃষি-গবেষণার নতুন কেন্দ্র — তবে এখনো এটি প্রস্তাবের পর্যায়েই, পাঠক যেন এই পার্থক্যটা মনে রাখেন।

কীভাবে যাবেন ও কী মনে রাখবেন

ঝিনাইদহ শহর থেকে বাসে মহেশপুর উপজেলা সদর; খালিশপুর-হামিদনগর ও দত্তনগর দুটোই মহেশপুর থেকে স্থানীয় যানে (ভ্যান/ইজিবাইক) যাওয়া যায় — কোন দিকে আগে যাবেন, সদরে নেমে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে রুট ঠিক করুন। দত্তনগর কর্মরত বীজ খামার — ভেতরের এলাকায় ঘুরতে চাইলে খামার-কার্যালয়ের অনুমতি নেওয়া ভদ্রতা ও নিয়ম দুটোই; সড়ক থেকে দেখা বিস্তীর্ণ সবুজ খামার-ভূমিই বেশিরভাগ দর্শনার্থীর অভিজ্ঞতা। হামিদনগরে যাওয়া মানে একটি গ্রামের ভিটে দেখা — শ্রদ্ধা ও সংযমের সঙ্গে যান, ছবি তোলায় পরিবার-পরিজনের অনুমতি নিন। দুটো ঠিকানা মিলিয়ে মহেশপুরে অর্ধেক দিন থেকে এক দিন লাগতে পারে; থাকার ব্যবস্থা মহেশপুর সদর বা ঝিনাইদহ শহরে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

হামিদুর রহমান কোথায় জন্মগ্রহণ করেন, গ্রামটির বর্তমান নাম কী?

ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার খোর্দ খালিশপুর গ্রামে (জন্ম ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩); গ্রামটির নাম এখন হামিদনগর।

তিনি কত বছর বয়সে, কোথায় শহীদ হন?

মাত্র ১৮ বছর বয়সে — সাত বীরশ্রেষ্ঠের সর্বকনিষ্ঠ; ২৮ অক্টোবর ১৯৭১-এ মৌলভীবাজারের ধলাই সীমান্ত ফাঁড়ির যুদ্ধে, শত্রুর মেশিনগান পোস্ট ধ্বংস করতে গিয়ে। তাঁর প্রধান স্মৃতি-কমপ্লেক্স ধলাইতেই।

দত্তনগর খামার কত বড় ও কে গড়েন?

৫টি উপ-খামার মিলিয়ে ২,৭৩৭ একর (আবাদি ~২,৫০০ একর); প্রতিষ্ঠাতা হেমেন্দ্র নাথ দত্ত, প্রায় ১৯৪০ সালে। বর্তমানে বিএডিসির অধীনে বীজ উৎপাদন খামার — এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বীজ খামার হিসেবে স্বীকৃত।

খামারটিতে কি বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে?

প্রস্তাব আলোচনাধীন — অক্টোবর ২০২৬-এ কৃষিমন্ত্রী প্রস্তাবটি সক্রিয় বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন; এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

ভেতরে ঢোকা যাবে?

খামারটি কর্মরত সরকারি বীজ-উৎপাদন কেন্দ্র, পর্যটনকেন্দ্র নয় — সড়কপাশ থেকে দেখা যায়; ভেতরে যেতে কার্যালয়ের অনুমতি প্রয়োজন হতে পারে।

শেষকথা

মহেশপুরের এই দুই ঠিকানা মিলেই বাংলাদেশের গল্পের দুই মুখ — আত্মত্যাগ আর উৎপাদন। একদিকে ১৮ বছরের এক তরুণের নামে নামকরণ করা নীরব গ্রাম, অন্যদিকে ৮৬ বছরের পুরনো সবুজ প্রান্তর যেখানে এখনো দেশের কৃষকের বীজ জন্মায় — আর হয়তো একদিন গড়ে উঠবে বিশ্ববিদ্যালয়। দুটোর প্রতিই যত্ন থাকুক।